পূর্ব-পশ্চিম রিভিউ: দেশভাগের ক্ষত, শিকড়হারা বাঙালি ও ঘরহারার ইতিহাস

কেন কোনো কোনো নিজের ঘর ছাড়ার গল্প পড়তে গিয়ে আজও আমাদের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শূন্যতা জমে? আমি পাঠকদের বলব, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পূর্ব-পশ্চিম শুধু দেশভাগের উপন্যাস নয়; এটি আমাদের শিকড়, লজ্জা, ভাষা, ভালোবাসা আর ফেরার অসম্ভব ইচ্ছার ইতিহাস।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পূর্ব-পশ্চিম বাংলা সাহিত্যের একটি মহাকাব্যিক উপন্যাস। এটি কেবল দুটি খণ্ডের একটি বিশাল আখ্যানই নয়, এটি ভারত ভাগ (দেশভাগ), দুই বাংলার মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব, ওপার বাংলার (বাংলাদেশের) স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং এপার বাংলার নকশাল আন্দোলনের এক জীবন্ত দলিল।

এক বাক্যে, পূর্ব-পশ্চিম হলো হারানো পূর্ববঙ্গ, উদ্বাস্তু কলকাতা, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, নকশাল-সময়ের অস্থিরতা এবং আমেরিকাগামী প্রজন্মের ভেতর দিয়ে বাঙালির ঘর হারানো ও নতুন ঘর বানানোর মহাকাব্যিক উপন্যাস।

যারা ঔপন্যাসিক আখ্যানের মাঝে ইতিহাসের টান খুঁজে পান, দেশভাগ ও তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে গভীর আগ্রহ আছে, এবং বাংলা সাহিত্যের ‘ম্যাগনাম ওপাস’ পড়ার স্বাদ নিতে চান তাদের জন্য পূর্ব-পশ্চিম একটি উত্তম পাঠ। আর দ্রুতগতির প্লট ও অ্যাকশনপ্রিয় পাঠক; যাদের কাছে ৯০০-১০০০ পৃষ্ঠার ধীরলয়ের উপন্যাসে মন বসে না পূর্ব-পশ্চিম তাদের জন্য নয় ।

১. পরিচিতি: বই, লেখক ও প্রকাশ-তথ্য

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পূর্ব-পশ্চিম আমার কাছে বাংলা সাহিত্যের সেই বিরল বইগুলোর একটি, যেখানে ব্যক্তিগত পারিবারিক ট্র্যাজেডি ধীরে ধীরে জাতির ইতিহাসে পরিণত হয়।

আনন্দ পাবলিশার্স দ্বারা প্রকাশিত হয় জানুয়ারী ১৯৮৯ সালে। পূর্ব-পশ্চিম ১৯৮৯ সালে আনন্দ পুরস্কার লাভ করে।

আমার ২০ সেরা বাংলা বইয়ের তালিকায় পূর্ব-পশ্চিম রাখার প্রধান কারণ হলো, এটি শুধু “দেশভাগের কষ্ট” বলে থেমে যায় না; এটি দেখায় দেশভাগ কীভাবে শয্যা, রান্নাঘর, ট্রেনের কামরা, প্রেম, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সন্তানের মৃত্যু, পাসপোর্ট—সবকিছুর ভেতরে ঢুকে পড়ে।

২. পটভূমি

পূর্ব-পশ্চিম পড়ার আগে মনে রাখা দরকার, ১৯৪৭-এর দেশভাগ বাংলা ভূখণ্ডকে দুই ভাগে কেটে দেয়—পশ্চিমবঙ্গ ভারতীয় প্রদেশ, পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশ; পরে পূর্ববঙ্গ পূর্ব পাকিস্তান এবং ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ। এই রাজনৈতিক পরিবর্তন মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে কী করেছিল, সেটাই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় চরিত্রের পর চরিত্র, শহরের পর শহর, স্মৃতির পর স্মৃতি দিয়ে ধরেছেন।

উপন্যাসের পটভূমিতে আছে দেশভাগ, উদ্বাস্তু জীবনের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, কলকাতার বাসস্থান-সংকট, পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক উত্তাপ, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ, নকশাল সময়, এবং পরবর্তী প্রজন্মের আমেরিকা-যাত্রা। ফলে বইটি একই সঙ্গে পরিবারগাথা, দেশভাগ-উপন্যাস, রাজনৈতিক উপন্যাস এবং প্রবাসী অস্তিত্বের গল্প।

৩. পূর্ব-পশ্চিম সাবাংশ

মূল বিষয়

‘পূর্ব-পশ্চিম’ উপন্যাসের মূল ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে দেশভাগের যন্ত্রণা এবং শিকড়চ্যুত হওয়ার বেদনার ওপর। উপন্যাসের নামটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে এর গভীর অর্থ:

  • পূর্ব: তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ), যা চরিত্রদের আদি শিকড়।
  • পশ্চিম: পশ্চিমবঙ্গ (কলকাতা ও দেওঘর), যেখানে রিফিউজি বা উদ্বাস্তু হয়ে আসতে হয়েছে ওপার বাংলার হিন্দুদের। একই সাথে ‘পশ্চিম’ বলতে এখানে ইউরোপ-আমেরিকাকেও বোঝানো হয়েছে, যেখানে পরবর্তী প্রজন্ম পাড়ি জমায়।

ভূমিকা ও মূল চরিত্র পরিচিতি

উপন্যাসের শুরু ১৯৪৭ সালের কিছু আগে ও পরে। কেন্দ্রীয় চরিত্র প্রতাপ মজুমদার (ডাকনাম থেকন), একজন আদর্শবাদী, সৎ ও স্বাভিমানী আইনজীবী। তাঁর বাড়ি ছিল পূর্ববাংলার মালখানগর গ্রামে। দেশভাগের পর তাঁর পরিবার ভিটেমাটি ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় চলে আসে, প্রথমে বাগবাজার ও পরে কালীঘাটে ভাড়া বাড়িতে। তাঁর স্ত্রী মমতা, দিদি সুপ্রীতি (বিধবা), ছেলে পিকলু (অসীম, মেধাবী ও আদর্শবাদী), বাবলু (অতীন, দুরন্ত ও বিদ্রোহী) এবং ছোট মেয়ে মুন্নি।

অপর পাশে আছে মামুন (সৈয়দ মোজাম্মেল হক), প্রতাপের কলেজ বন্ধু, একজন মুসলমান কবি ও রাজনৈতিক কর্মী। মামুনের বাড়ি দায়ুদকান্দি, গ্রামে। সে গ্রামে প্রতাপের সঙ্গে পরিচয় হয় বুলা (গায়ত্রী চক্রবর্তী) নামে এক ব্রাহ্মণ কন্যার, যে পরে প্রতাপের মনে গভীর দাগ ফেলে যায়।

অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চরিত্ররা হলেন: সুলেখা (ত্রিদিবের স্ত্রী, প্রতাপের শ্যালিকা, অপরূপা নারী), বিমানবিহারী (প্রতাপের বন্ধু, প্রকাশক), কানু (প্রতাপের সৎভাই, চালাক ও কালোবাজারি), চন্দ্রা (সমাজসেবিকা, পরে সন্ন্যাসিনী চন্দ্রামা), হারীত মণ্ডল (উদ্বাস্তু নেতা), অলি ও বুলি (বিমানবিহারীর মেয়ে) প্রমুখ।

উপন্যাস শুরু হয় একেবারে ঘরোয়া দৃশ্য দিয়ে।

প্রতাপ মজুমদার তার পরিবার নিয়ে কলকাতার বাগবাজার থেকে দেওঘর যাচ্ছেন। ঘোড়ার গাড়ি, বিছানা, সুটকেস, ট্রাঙ্ক, পরোটা-আলুর দম, বাচ্চাদের অস্থিরতা—সব মিলিয়ে এক বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের যাত্রা। কিন্তু খুব দ্রুত বোঝা যায়, এই যাত্রা শুধু ভ্রমণ নয়; এর ভেতরে আছে হারানো দিকের বেদনা।

ট্রেনে প্রতাপের প্রথম শ্রেণি থেকে তৃতীয় শ্রেণিতে নেমে আসা তার সামাজিক পতনের, আত্মসম্মানের এবং দেশভাগ-পরবর্তী ভাঙনের চিহ্ন। কনু বাবলুকে বলে, “আমাদের দেশ ছিল অন্য দিকে”—এই ছোট বাক্যই উপন্যাসের গভীরতম দরজা খুলে দেয়।

প্রতাপের পরিবার একসময় পূর্ববঙ্গের মালখানগরে সচ্ছল ছিল। তার বাবা ভবদেব বিশ্বাস করতেন দেশভাগ স্থায়ী হবে না। তিনি এমনকি যারা পূর্ববঙ্গ ছেড়ে চলে যাচ্ছিল, তাদের সম্পত্তিও কিনে রাখছিলেন—ভেবে যে একদিন তারা ফিরে আসবে। তিনি বিশ্বাস করতেন ১৯৪৭ সালের দেশভাগ সাময়িক, ১৯৫৭ সালের মধ্যে দুই বাংলা আবার এক হয়ে যাবে। এই অন্ধ বিশ্বাসে তিনি ওপারেই থেকে যান এবং হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। বাবার মৃত্যুর পর প্রতাপদের বিশাল সম্পত্তি ও বাড়ি ওখানকার সরকার অধিগ্রহণ করে নেয়। প্রতাপ কলকাতায় এসে এক চিলতে ভাড়া বাড়িতে আশ্রয় নেন।

কিন্তু ইতিহাস কারও ব্যক্তিগত বিশ্বাসের কাছে মাথা নত করে না। ভবদেব মারা যান, প্রতাপ পিতৃশ্রাদ্ধ করতে গিয়ে বুঝতে পারেন—পূর্বপুরুষের ভিটের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হলো। মাটি, পুকুর, খেজুরের রস, দিগন্ত, কাশবন—সব রয়ে গেল এক দিকে; মানুষ চলে এল অন্য দিকে। এখানেই উপন্যাসের এক প্রধান রূপক: মানুষকে যেন “মাটি থেকে উপড়ে তোলা” হলো।

দেওঘরের সুহাসিনীধাম হলো সেই হারানো পূর্ববঙ্গের ক্ষুদ্র প্রতিস্থাপন।

এখানে আছে প্রতাপের মা সুহাসিনী, বোন শান্তি, জামাইবাবু বিশ্বনাথ গুহ। বিশ্বনাথ শিল্পীস্বভাবের, খেয়ালি, সংসারী নন; তার মধ্যে বাঙালির এক আলাদা স্বাধীন আত্মা আছে। কিন্তু ইতিহাস এমন স্বাধীন মানুষকেও শেষ পর্যন্ত সংসারে নামিয়ে আনে। অন্যদিকে কলকাতার আরেক শাখায় সুপ্রীতি-অসিতদের পরিবার, পুরনো বনেদিয়ানা ভেঙে পড়ছে।

প্রতাপের সঙ্গে বুলার একটি অসমাপ্ত প্রেমের সম্পর্কের ইঙ্গিত থাকে।

ফ্ল্যাশব্যাকে জানা যায়, কলেজে পড়ার সময় প্রতাপ তাঁর বন্ধু মামুনের সাথে কুমিল্লার দায়ূদকান্দিতে তাদের গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল। কিন্তু মামুনের বাবা সৈয়দ আবদুল হাকিম চরম হিন্দুবিদ্বেষী ও রক্ষণশীল হওয়ায় প্রতাপকে নিজের বাড়িতে রাত্রিযাপন করতে দেননি। তাই আবদুল হাকিমের অনুরোধে প্রতাপকে পাশের গ্রামের জমিদার সত্যসাধন চক্রবর্তীর বাড়িতে থাকতে হয়।

সেই সত্যসাধনের ভাইজিই ছিল বুলা, যার পুরো নাম প্রীতিলা। ঝড়ের রাতে বুলার সাথে প্রতাপের প্রথম দেখা হয়। বুলা গান গাইত। প্রতাপের অবচেতন মনে বুলার প্রতি একটি গোপন দুর্বলতা তৈরি হয়েছিল, যা বহু বছর পর দেওঘরে সত্যেনদের সাথে বুলাকে দেখে আবার জাগ্রত হয়। কিন্তু সময়ের নিয়মে বুলা ও প্রতাপের পথ আলাদা হয়ে যায়। প্রতাপের বিয়ে হয় মমতার সাথে।

যদিও প্রতাপ বুলাকে বিয়ে করতে পারে না — কারণ বুলা ব্রাহ্মণ, আর প্রতাপ কায়স্থ। সমাজের চোখে এ ছিল বেমানান। বুলা পরে নরেন নামে এক ব্যারিস্টারকে বিয়ে করে, যে ইতিমধ্যেই ইংল্যান্ডে আরেক নারীকে বিয়ে করেছে, ফলে বুলার সংসার ভেঙে যায়।

উদ্বাস্তুদের দখল, সম্পত্তি বিক্রি, চাকরি হারানো, মানসিক বিপর্যয়—সব মিলিয়ে উপন্যাস দেখায়, দেশভাগ শুধু পূর্ববঙ্গের হিন্দু পরিবারের নয়, পশ্চিমবঙ্গের পুরনো অভিজাত বাড়িগুলোরও ভাঙন ঘটায়।

পিকলু ও বাবলু — দুই ভাইয়ের মধ্যে পিকলু অত্যন্ত মেধাবী, নম্র, আদর্শবাদী। বাবলু পড়াশোনায় অমনোযোগী, দুরন্ত, কিন্তু বুদ্ধিমান। উপন্যাসের এক মর্মান্তিক অংশে, গঙ্গাস্নানে গিয়ে বাবলু ডুবে যেতে থাকে, পিকলু তাকে বাঁচাতে গিয়ে নিজে ডুবে মারা যায়। এই ঘটনা প্রতাপ ও মমতার জীবনে চরম বিপর্যয় নিয়ে আসে। মমতা এই শোকে প্রায় পাগল হয়ে যান এবং একসময় মানসিক ও শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েন।

এই মৃত্যু উপন্যাসের সবচেয়ে নির্মম বাঁক। বাবলু বেঁচে থাকে, কিন্তু পিকলুর মৃত্যু তার জীবনের ভেতরে অপরাধবোধের অদৃশ্য পাথর হয়ে বসে যায়। মমতা ভেঙে পড়েন; প্রতাপের ভিত আরও ফেটে যায়। বাবলু বড় হতে হতে অতীন হয়ে ওঠে—কিন্তু তার ভেতরে যে বেঁচে থাকার দায়, সেটি কখনো মুছে যায় না।

যৌবন পর্বে অতীন কলকাতার শিক্ষিত, রাজনৈতিক, অস্থির তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি। সে শুধু পরিবারের ছেলে নয়; সে নতুন শহরের, নতুন দেশের, নতুন সময়ের সন্তান। তার চারপাশে আছে নকশাল-ভাবনা, রাজনৈতিক তর্ক, “দেশ” বলতে কী বোঝায় সেই প্রশ্ন, বামপন্থী বৃত্ত, বন্ধুত্ব, প্রেম, শরীর, অপরাধবোধ, ভেসে যাওয়ার প্রবণতা। অলির সঙ্গে তার সম্পর্ক অস্বস্তিকর ও জটিল; আজকের পাঠক সম্মতি, ক্ষমতা ও লিঙ্গ-রাজনীতির চোখে এই অংশকে প্রশ্ন করতেই পারেন। শর্মিলার সঙ্গে তার সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে পরিণত, কিন্তু অতীনের ভিতরে কখনো স্থির ঘর তৈরি হয় না।

অপর দিকে, মামুনের চরিত্রে দেখা যায় বাঙালি মুসলমানদের স্বাধীনতার পরে পাকিস্তানে গিয়ে প্রতারিত হওয়ার কাহিনী। তারা দেখে, পাকিস্তান শুধু নামে মুসলমানদের দেশ, প্রকৃত ক্ষমতা ও অর্থনীতি পশ্চিম পাকিস্তানিদের (পাঞ্জাবিদের) হাতে।

পূর্ব পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলন, বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান এবং শেখ মুজিবর রহমানের ছয় দফা দাবি — সবই মামুনের চোখে ফুটে ওঠে। মামুনের ভাগ্নি মঞ্জু (বিলকিস) ওরফে বাবুল চৌধুরীকে (আলতাফের ছোট ভাই) বিয়ে করে। বাবুল চৌধুরী একজন আদর্শবাদী, যিনি পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার আন্দোলনে যুক্ত হন।

এদিকে পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম বাঙালি চরিত্রদের জীবনও উপন্যাসে প্রবলভাবে আসে। মামুন, রুমি, শাহজাহানদের ভেতর দিয়ে বোঝা যায়, পূর্ববঙ্গ শুধু প্রতাপের হারানো জন্মভূমি নয়; সেটি আরেক জাতীয় চেতনার জন্মস্থানও। ভাষা, পরিচয়, ধর্ম, পাকিস্তানি রাষ্ট্র-ক্ষমতার দমন, মুক্তিযুদ্ধ—সব মিলিয়ে পূর্ববঙ্গ ধীরে ধীরে বাংলাদেশে পরিণত হয়।

অতীন পরে আমেরিকায় যায়। নাগরিকত্ব বদল করে আমেরিকার পাসপোর্ট নিয়েছে।সুনীল লিখেন “এ দেশে (আমেরিকায়) যে সব ভারতীয় দম্পতি অনেকদিন আছে, তারা সময়মত স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে একজন ভারতীয় পাসপোর্ট রেখে দেয়। অন্যজন আমেরিকান পাসপোর্ট নেয়। তাতে দুই নৌকায় পা রাখা যায়। অতীন নিজের পাসপোর্ট বদলেছে শুধু কাজের সুবিধের জন্য। কোম্পানীর কাজে তাকে বিভিন্ন দেশে যেতে হয়, ভারতীয় পাসপোর্ট থাকলে অনেক দেশের ভিসা পেতে ঝামেলা ও সময় লাগে। বিশেষত চিন তো ভিসা দিতেই চায় না। তার কোম্পানীই বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে তার আমেরিকান সিটিজেনশিপের ব্যবস্থা করে দিয়েছে।”

বাইরে থেকে এ যেন সাফল্য: পূর্ববঙ্গ-উদ্বাস্তু পরিবারের এক ছেলে বিশ্বমানের শিক্ষাজগতে পৌঁছে গেছে। কিন্তু উপন্যাস ধীরে ধীরে দেখায়, প্রবাস মানেই মুক্তি নয়। বরং পূর্ব-পশ্চিমের নতুন ফাঁদ। দেশে ফিরতে চাইলে পাসপোর্ট লাগে, ভিসা লাগে, ছুটি লাগে, টিকিট লাগে, অর্থ লাগে, এবং তার চেয়েও বেশি লাগে মনের অনুমতি। অতীন বুঝতে পারে, সে এক অদ্ভুত মধ্যবর্তী অবস্থায় আটকে গেছে—না পুরো পূর্ব, না পুরো পশ্চিম।

শেষের দিকে প্রতাপ অসুস্থ, মানসিকভাবে বিধ্বস্ত। তার জীবনজুড়ে যে দেশহারা বেদনা, পুত্রশোক, মূল্যবোধের পতন এবং একাকিত্ব জমেছিল, তা শেষ পর্যন্ত তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। খবর পেয়ে অতীন দেশে ফিরতে চায়, কিন্তু বাস্তবতার দেয়াল—টিকিট, ভিসা, আমেরিকান পাসপোর্ট, কাজের দায়—তাকে আটকে রাখে। এই অংশে পূর্ব-পশ্চিম এক ভয়ংকর সত্যে পৌঁছায়: মানুষ যতই বিশ্বনাগরিক হোক, বাবার মৃত্যুশয্যার কাছে যাওয়ার অধিকারও কখনো কাগজের নাগরিকত্বে আটকে যায়।

উপন্যাসের শেষ দৃশ্যে প্রতাপের চেতনা ফিরে যায় মালখানগরে—পুরনো ঘাটে, মায়ের কাছে, হারানো জলের কাছে।

সমাপ্তি

এখানে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রতাপ মজুমদারের মৃত্যুকে সরাসরি “মৃত্যু” হিসেবে না দেখিয়ে এক ধরনের স্বপ্নময় ঘরে-ফেরা হিসেবে লিখেছেন।

অতীন তখন দূরে, ডেনভারের রাতের আকাশের নিচে। আর একই সময়ে কলকাতার এক নার্সিংহোমে প্রতাপ মজুমদার মৃত্যুশয্যায়। বাইরে লোকজন জমেছে, কিন্তু ICU-তে আছে শুধু অলি। মমতা এখনও আসেননি, তুতুল পথে, অতীনের কোনো বার্তাও পৌঁছোয়নি। অথচ প্রতাপ আর এইসব অনুপস্থিতির অভাব অনুভব করছেন না। তাঁর চেতনা ফিরে এলেও তিনি বাস্তব থেকে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছেন।

তিনি অলিকে জানলা খুলতে বলতে চান, কিন্তু মুখে শব্দ বেরোয় না। তবু যেন কেউ জানলা খুলে দেয়। তারপর প্রতাপ আর নার্সিংহোম দেখেন না; তিনি দেখতে থাকেন সবুজ মাঠ, নদী, জলাভূমি, পুরোনো বাড়ি, মাজার, মন্দির—শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যান মালখানগরের মজুমদারদের নিজস্ব ঘাটে, অর্থাৎ তাঁর হারানো পূর্ববঙ্গের পৈতৃক ভিটেতে।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতাপ অবাক হয়ে ভাবেন—ভিসা লাগল না, পাসপোর্ট লাগল না, তবু তিনি ফিরে এলেন। সারা জীবন যে দেশভাগ তাঁকে পূর্ববঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল, মৃত্যুর মুহূর্তে সেই সীমান্ত আর থাকে না। বাস্তবের রাষ্ট্র তাকে আটকেছিল; স্মৃতি ও মৃত্যু তাকে মুক্ত করে।

ঘাটে তিনি দেখেন তাঁর মা সুহাসিনীকে—যুবতী, নীল শাড়ি পরা, যেন বহু বছর আগের সেই মায়ের রূপে। প্রতাপের মনে পড়ে, মৃত্যুর আগে মা তাঁকে বলেছিলেন, তাঁকে যেন আবার সেই বাড়িতে নিয়ে যায়। জীবনে প্রতাপ তা করতে পারেননি; কিন্তু মৃত্যুর এই অন্তর্জগতে মা নিজেই সেখানে পৌঁছে আছেন।

তারপর প্রতাপ যেন শিশুর মতো আনন্দে বলে ওঠেন—তিনি মায়ের কাছে যাচ্ছেন, আর কেউ তাঁকে ধরতে পারবে না। কিন্তু মায়ের কাছে যাওয়ার আগে তাঁর মনে হয়, শরীরে কাদা-ময়লা লেগে আছে। তিনি যেন নর্দমার ধারে শুয়ে ছিলেন—এটি তাঁর অপমান, পতন, জীবনের ক্লান্তি ও মৃত্যুশয্যার অসহায়তার প্রতীক। তাই মাকে জড়িয়ে ধরার আগে তিনি নিজেকে পরিষ্কার করতে চান।

শেষে তিনি ঘাটের জলে নামেন। জল তাঁর কাছে স্নিগ্ধ, মমতাময়, মায়ের স্পর্শের মতো। প্রতাপ সেই জলে ডুব দেন। এই ডুবই আসলে তাঁর মৃত্যু—কিন্তু লেখক সেটিকে ভয়ংকর নয়, বরং শুদ্ধি, মুক্তি ও মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখিয়েছেন।

প্রতাপের মৃত্যু মানে শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়; এটি এক দেশহারা মানুষের শেষবারের মতো নিজের মাটি, নিজের ঘাট, নিজের মায়ের কাছে ফিরে যাওয়া। পূর্ব-পশ্চিম জুড়ে যে শিকড়হারা বেদনা ছিল, এই দৃশ্যে তা এক গভীর, করুণ কিন্তু শান্তিপূর্ণ সমাপ্তি পায়।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এই উপন্যাসে দেখিয়েছেন, কীভাবে ইতিহাস ব্যক্তিজীবনকে দুর্বিসহ করে তোলে। প্রতিটি চরিত্র ‘পূর্ব’ আর ‘পশ্চিমের’ দোলাচলে দিশা হারায় — পূর্বের মাটি ছাড়তে না পারে, আবার পশ্চিমের শহরে টিকে থাকতে চায়। যারা পূর্ব বাংলার ভিটে ছেড়েছে, তারা আজীবন শিকড়ের খোঁজে থাকে। যারা পশ্চিম বাংলায় থেকেছে, তারা উদ্বাস্তু বোঝা ঘৃণা করে। এই দ্বান্দ্বিকতা কখনো শেষ হয় না।

শেষ পর্যন্ত, দেশভাগ মানুষের হৃদয়কেও ভাগ করে দিয়েছে। ‘পূর্ব-পশ্চিম’ উপন্যাসটি সেই বিভক্ত হৃদয়ের চূড়ান্ত নথি।

৪. পূর্ব-পশ্চিম পর্যালোচনা

৪.১ পূর্ব-পশ্চিম চরিত্র সমূহ

প্রতাপ মজুমদার: প্রতাপ এই উপন্যাসের নৈতিক কেন্দ্র। তিনি আত্মসম্মানী, কঠোর, আদর্শবাদী, কখনো অহংকারীও। তিনি দুর্নীতি সহ্য করেন না, কিন্তু সেই সততার যুগ যেন শেষ হয়ে যাচ্ছে—এটাই তার ট্র্যাজেডি। দেশ হারানো, পিতৃভূমি হারানো, পুত্র হারানো এবং শেষ বয়সে নিজের কর্তৃত্ব হারানো—সব মিলিয়ে প্রতাপ এক ইতিহাস-ক্ষত মানুষ।

মমতা: মমতা উপন্যাসের নীরব সহনশক্তি। তিনি ঘর সামলান, সন্তান সামলান, প্রতাপের জেদ সামলান, শোক সামলান। পিকলুর মৃত্যুর পর তার ভেঙে পড়া শুধু এক মায়ের কান্না নয়; এটি হারিয়ে যেতে থাকা পারিবারিক স্থিতির কান্না।

বাবলু/অতীন: অতীন বেঁচে থাকা মানুষের অপরাধবোধের চরিত্র। পিকলুর মৃত্যু তাকে ভিতর থেকে বদলে দেয়। পরে সে শিক্ষিত, রাজনৈতিকভাবে সচেতন, প্রেমিক, প্রবাসী—সব হয়; কিন্তু মুক্ত হয় না। তার জীবনে সাফল্য আছে, অথচ শান্তি নেই। এই কারণেই অতীন আধুনিক বাঙালির শক্তিশালী প্রতীক।

পিকলু: পিকলু দীর্ঘদিন উপস্থিত না থেকেও উপন্যাসে থেকে যায়। সে মৃত ভাই, হারানো সম্ভাবনা, পরিবারের অমোচনীয় ক্ষত। তার মৃত্যু অতীনের চরিত্র গড়ে দেয়।

কনু: কনু বাস্তববাদী। সে বোঝে নতুন যুগে শুধু আদর্শ দিয়ে চলা যায় না। তার grey-market ধরনের কাজ প্রতাপের চোখে নৈতিক পতন, কিন্তু বাস্তবের চোখে তা বেঁচে থাকার কৌশল। কনু তাই দেশভাগ-পরবর্তী অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র।

বিশ্বনাথ গুহ: বিশ্বনাথ শিল্প, সঙ্গীত, বাউন্ডুলে স্বাধীনতা এবং সংসার-বিমুখতার প্রতীক। কিন্তু ইতিহাস তাকে-ও পরিবার ও দায়িত্বে টেনে আনে। তার চরিত্র উপন্যাসে কোমলতা যোগ করে।

মামুন, রুমি, শাহজাহান: এরা পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের দিকে যাত্রার চরিত্র। এদের মাধ্যমে বোঝা যায়, “পূর্ব” শুধু হিন্দু উদ্বাস্তুদের স্মৃতি নয়; মুসলিম বাঙালির ভাষা, স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রচেতনার সংগ্রামও।

শর্মিলা, অলি, সুপ্রীতি, তুতুল: নারী চরিত্রগুলো উপন্যাসে শুধু প্রেম বা সম্পর্কের অবলম্বন নয়। তারা ঘরের ভাঙন, শরীরী অনিশ্চয়তা, সামাজিক শর্ত, মানসিক শ্রম এবং পুরুষের ভাঙন বহন করে। তবে আজকের পাঠকের কাছে কিছু নারী-পুরুষ সম্পর্ক সমস্যাজনক লাগতে পারে—এটাই বইটির contemporary rereading-এর জায়গা।

৪.২ পূর্ব-পশ্চিম বিষয়বস্তু

দেশ বনাম ঘর: উপন্যাসের বড় প্রশ্ন—দেশ কি মানচিত্র, না স্মৃতি? প্রতাপের কাছে দেশ হলো মালখানগর; অতীনের কাছে দেশ ক্রমে দ্বিধাগ্রস্ত; মামুনদের কাছে দেশ হয়ে ওঠে বাংলাদেশ।

ট্রেন ও যাত্রা: উপন্যাস শুরুই হয় যাত্রা দিয়ে। ট্রেন এখানে শুধু পরিবহন নয়; শ্রেণি-পতন, উদ্বাস্তুতা, স্থানান্তর এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রতীক।

জল: গঙ্গার জল পিকলুর মৃত্যু আনে; শেষের জল প্রতাপকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে নেয়। জল তাই মৃত্যু, স্মৃতি ও মুক্তির দ্বৈত প্রতীক।

পাসপোর্ট ও ভিসা: শেষ পর্বে পাসপোর্ট-ভিসা আধুনিক রাষ্ট্রের নির্মম প্রতীক। মানুষ নিজের বাবার কাছে ফিরতে গেলেও কাগজের অনুমতির বন্দী।

পূর্ব-পশ্চিম: শিরোনাম শুধু ভূগোল নয়। পূর্ব মানে জন্ম, স্মৃতি, মাতৃভূমি; পশ্চিম মানে গমন, সাফল্য, আধুনিকতা, বিচ্ছেদ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেউ কোনো দিকেই পুরোপুরি মুক্ত নয়।

৫. পূর্ব-পশ্চিম মূল্যায়ন: আমার মতামত

আমার কাছে পূর্ব-পশ্চিম বাংলা কথাসাহিত্যের এক মর্মভেদী, অসমাপ্ত-ব্যথার মহাকাব্য—যেখানে ইতিহাসের বড় মানচিত্র শেষ পর্যন্ত একটি মানুষের মায়ের কাছে ফেরার আকাঙ্ক্ষায় এসে ঠেকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে যেভাবে সুনীল তুলে ধরেছেন তা অতুলনীয়। তিনি কেবল আমাদের ইতিহাস শেখান না, ইতিহাসকে তিনি দ্বিপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন।

প্রতাপের মাঝে আমি বরাবরই নিজেকে খুঁজে পাই। আমিও তাঁর মতো গ্রাম, মাটির গন্ধ, ভিটেবাড়ি, গাছ-পালা, মাঠঘাট সব মিস করি ভীষণ।

পূর্ব-পশ্চিম এর শক্তিশালী দিক

এই বইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বিস্তার। সুনীল এক পরিবার দিয়ে শুরু করে পুরো বাঙালি ইতিহাসকে ধরেছেন। চরিত্রগুলো জীবন্ত, সংলাপ স্বাভাবিক, শহর-গ্রাম-দেশ-প্রবাসের বর্ণনা স্পর্শযোগ্য। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি ইতিহাসকে বক্তৃতা বানাননি; রান্নাঘর, ট্রেন, পুকুর, গয়না, চাকরি, প্রেম, শোক—এই ছোট জিনিসে ইতিহাস ঢুকিয়েছেন।

পূর্ব-পশ্চিম এর দুর্বল দিক

উপন্যাস দীর্ঘ; অনেক পাঠকের কাছে গতি ধীর লাগতে পারে। কিছু উপকাহিনী হয়তো কেন্দ্রীয় গল্প থেকে দূরে সরে গেছে বলে মনে হবে। আবার কিছু নারী চরিত্রের অভিজ্ঞতা পুরুষ চরিত্রের অপরাধবোধ দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে—আজকের পাঠক সেখানে প্রশ্ন তুলতে পারেন।

প্রভাব/বিতর্ক

বইটি পড়ার পর আমার মনে হয়েছে, উদ্‌বাস্তু হওয়া শুধু বাড়ি হারানো নয়; নিজের ভাষার ভেতরেও অচেনা হয়ে যাওয়া। এক ইতিহাস নির্ভর কল্পকাহিনি হিসেবে এমন বই স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক অধ্যয়ন, সাম্প্রদায়িক অধ্যয়ন, লৈঙ্গিক অধ্যয়ন—সব দিক থেকেই বিতর্ক জাগাতে পারে। কিন্তু বড় বড় সাহিত্য এখানেই টিকে থাকে—তা আমাদের অস্বস্তিতে পর্যবসিত করে।

উপন্যাসটি ‘দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশের সময় থেকেই বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। ১৯৪৭-এর বিভাজনোত্তর বাংলার ইতিহাসকে যেভাবে তিনি ফুটিয়েছেন, বিশেষ করে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ও নকশাল আন্দোলনের রক্তাক্ত অধ্যায়গুলো উপেক্ষা করার মতো ছিল না। তবে কিছু সমালোচকের মতে, রাজনৈতিক তত্ত্ব অনেক বেশি চরিত্রের মুখে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

তবুও, সামগ্রিকভাবে পূর্ব-পশ্চিম কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সবচেয়ে সাহসী ও দূরদর্শী উপন্যাসগুলোর মধ্যে একটি বলে ধরে নেওয়া হয়।

পূর্ব-পশ্চিম এর মত বই

সুনীলের সেই সময় ও প্রথম আলো যেমন উনিশ শতকের বাঙালি নবজাগরণকে উপন্যাসে রূপ দেয়, পূর্ব-পশ্চিম তেমন বিশ শতকের দেশভাগ-পরবর্তী বাঙালিকে ধরে। অমিতাভ ঘোষের The Shadow Lines স্মৃতি ও সীমান্তকে বেশি দার্শনিকভাবে দেখে; পূর্ব-পশ্চিম বেশি পারিবারিক, বিস্তৃত এবং আবেগন।

৬. সমসাময়িক শিক্ষামূলক প্রাসঙ্গিকতা ও ৫টি শিক্ষা

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতে উগ্র জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও অভিবাসনের মতো জটিল বিষয়গুলো বার বার মাথা চাড়া দেয়। এই উপন্যাসটি প্রায় ৫০০ পৃষ্ঠা জুড়ে দেখায়, কীভাবে রাজনৈতিক সীমানা শুধু ভূমিকেই নয়, মানবসম্পর্ককেও অপরিচিত করে তোলে। ২০২৩ সালে পশ্চিমবঙ্গে উদ্বাস্তু ইস্যু নিয়ে যে রাজনৈতিক উত্তাপ ছিল, তার বীজ বপন হয়েছিল ১৯৪৭-এর বিভাজনেই। উপন্যাসটির আজকের প্রাসঙ্গিকতা অনস্বীকার্য।

১. সীমান্ত দ্রুত বদলায়, কিন্তু স্মৃতি বদলায় না।

২. প্রতাপের মনস্তত্বের মধ্য দিয়ে দেখা যায় যে, কীভাবে মানুষ সম্পদ হারালে তার আত্মমর্যাদা বাঁচিয়ে চলার এক নব্য যুদ্ধে লিপ্ত হয়। পৃষ্ঠা ১২-এ প্রতাপের ‘নিজের বোনের গয়নাও বাঁচাতে না পারার গ্লানি’ যে কোন বাস্তব উদ্বাস্তুকে নাড়া দেবে।

৩. মামুনের চরিত্রটির মধ্য দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের (পরে বাংলাদেশ) ভাষা আন্দোলন ও নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার সংগ্রামকে অত্যন্ত দরদের সঙ্গে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বিশেষ করে মামুনের ‘আমরা মুসলমান হয়েও বাঙালি’ বলে নিজেকে দাবি করার আগ্রহটি বিশেষ শিক্ষণীয়।

৪. শিক্ষা ও বিদেশযাত্রা মানুষকে সফল করতে পারে, কিন্তু সব অপরাধবোধকে মুছতে পারে না।

৫. নারীর স্বাধীনতা ও দুরবস্থা: বুলা, সুলেখা, তুতুল—এই তিন ভিন্ন প্রজন্মের নারী চরিত্রগুলো কীভাবে পুরুষশাসিত সমাজে নিজেদের জায়গা করে নেয় বা হারায়, তা উদ্বাস্তু ও মধ্যবিত্ত প্রেক্ষাপটে বোঝানো হয়েছে।

৭. ‘পূর্ব-পশ্চিম’ থেকে নির্বাচিত উদ্ধৃতি

“আত্মগোপন করতে গিয়ে কিছুদিন পর অনেকে আত্মপরিচয়টাই ভুলে যায়।”

— সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, পূর্ব-পশ্চিম

“পিতৃশ্রাদ্ধ করতে প্রতাপ শেষবার গিয়েছিলেন মালখানগরে।… পূর্ববাংলার এই নদীময় প্রান্তর, এই মিষ্টি বাতাস, খেজুর রসের স্বাদের মতন ভোর, ঠাকুমার গল্পের আমেজমাখা সন্ধ্যা, এসব আর দেখা হবে না। এরপর থেকে কলকাতায় ভাড়াটে বাড়ির অন্ধকার ঘুপচি ঘরে চির নির্বাসন।”

— সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, পূর্ব-পশ্চিম

“মানুষের সবচেয়ে শক্ত জিনিস কী জানিস? অন্য মানুষদের ঠিকমতন চেনা। দ্যাখ না, তুই আর আমি কত কাছাকাছি, অথচ দু’জনে দু’জনকে চিনি না।”

— সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, পূর্ব-পশ্চিম

৮. উপসংহার

পূর্ব-পশ্চিম কখনও শুধু উপন্যাস নয়। এটি একটি আয়না, যা আমাদের শেখায় ভূগোলের সীমানা দিয়ে মানুষ ও তার মননকে চিরকাল ‘পূর্ব’ আর ‘পশ্চিমে’ ভাগ করা যায় না। প্রতাপ থেকে মামুন, বাবলু থেকে অলি—প্রত্যেকটি চরিত্র যেন আমাদেরই আশপাশের চিরদিনের চেনা মানুষ।

পূর্ব-পশ্চিম পড়া সহজ নয়, কিন্তু জরুরি। এটি দেশভাগের বই, আবার কেবল দেশভাগের বই নয়; এটি পিতার বই, পুত্রের বই, মায়ের বই, ভাষার বই, প্রবাসের বই, এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের ফেরার অসম্ভব আকাঙ্ক্ষার বই।

যারা বাংলা সাহিত্যের গভীর, ঐতিহাসিক, আবেগময় ও বহুস্তরীয় উপন্যাস পড়তে চান, তাদের জন্য এটি অবশ্যপাঠ্য। আমার ব্যক্তিগত পাঠতালিকায় এটি নিঃসন্দেহে ২০ সেরা বাংলা বইয়ের একটি।

যারা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসকে ভালোবাসেন, যারা ধর্ম, জাতি ও আদর্শের সংকট বুঝতে চান, এবং যারা একটি বইয়ের পরতে পরতে জীবন খুঁজে পান, ‘পূর্ব-পশ্চিম’ তাঁদের জন্য এক অভিজ্ঞান। উপন্যাসটি কঠিন ও দীর্ঘ, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এর সবগুলো অধ্যায় পড়ে আমরা আরও সমৃদ্ধ ও সচেতন হয়ে উঠি।

Sopranu

About Sopranu

Sopranu is a Bangladeshi-born writer, lifelong bookaholic and devoted cinephile. He writes reviews, opinions and reflections shaped by close reading, careful research and a love of philosophy. Every piece on this site starts with the same question: what is this work really trying to say, and does it succeed?

Sopranu, writer and reviewer

Written by

Probin

I am Probin, a Bangladeshi-born writer and researcher, lifelong bookaholic and devoted cinephile, lover of literature and philosophy and an inquisitor of knowledge. I write reviews and reflections shaped by close reading, careful research and a love of philosophy. Every piece starts with one question: what is this work really trying to say, and does it succeed?

Leave a comment