Last updated on November 6th, 2026 at 11:39 am
কেন আমরা ইতিহাস পড়তে গিয়ে শুধু রাজনীতি দেখি, অথচ মানুষের ভয়, প্রেম, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও পতনকে ভুলে যাই? আমি পাঠকদের বলব, সেই সময় শুধু একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস নয়; এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের অস্বস্তিকর আয়না।
সেই সময় উনিশ শতকের বাংলা নবজাগরণকে ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক সংস্কার, ভণ্ডামি, প্রেম, ক্ষমতা ও বৌদ্ধিক জাগরণের এক জীবন্ত মানবিক মহাকাব্যে পরিণত করেছে।
যারা ইতিহাস-কেন্দ্রিক বাংলা উপন্যাস পড়তে ভালোবাসেন, যারা নবজাগরণের নানা দিক নিয়ে জানতে আগ্রহী, এবং যারা শুধু গল্প নয়, চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক ও আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট বোঝার চেষ্টা করেন সেই সময় তাদের জন্য । আর যারা দ্রুতগতির প্লট বা প্রচণ্ড রোমাঞ্চপ্রিয় পাঠক বইটি ধীর, গভীর, প্রায় গবেষণার মতো নিবিড় পর্যাবেক্ষণ তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
Table of Contents
১. পরিচিতি
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই সময় বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক উপন্যাস। ইংরেজি অনুবাদে বইটি Those Days নামে পরিচিত। সেই সময় প্রথমে দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল, পরে আনন্দ পাবলিশার্স থেকে বই আকারে বেরোয়, এবং ১৯৮৫ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করে।
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র নবীনকুমার—যার আদলে কালিপ্রসন্ন সিংহকে চেনা যায়—কিন্তু বইটি কোনো একক জীবনী নয়। বরং এটি ১৯শ শতকের কলকাতা, বাঙালি নবজাগরণ, সামাজিক সংস্কার, ব্রাহ্ম আন্দোলন, নারীশিক্ষা, বিধবা-বিবাহ, ইংরেজি শিক্ষার প্রভাব এবং পুরনো-নতুন বাঙালি সমাজের সংঘাতকে একসঙ্গে ধরে।
লেখকের নিজের ভাষ্যেও দেখা যায়, কাহিনির পটভূমি ১৮৪০–১৮৭০ খ্রিস্টাব্দ; তিনি ইতিহাস নয়, ইতিহাসের ভেতরে জীবিত মানুষের উপন্যাস লিখতে চেয়েছেন।
২. পটভূমি
সাধারনতঃ, বাংলা নবজাগরণকে আমরা বিদ্যাসাগর, রামমোহন, মধুসূদন, বঙ্কিম, ব্রাহ্ম সমাজ, নারীশিক্ষা, বিধবা-বিবাহ, ইংরেজি শিক্ষা—এই বড় বড় নাম ও ঘটনার মাধ্যমে বুঝি। কিন্তু সেই সময় আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সমাজ বদলানো মানে শুধু আইন বদলানো নয়; ঘরের ভেতরের ভয়, ধর্মীয় অনুশাসন, পুরুষতন্ত্র, বংশগৌরব, যৌনতা, অর্থ, শিক্ষার আকাঙ্ক্ষা এবং ভণ্ডামির সঙ্গে লড়াই করাও সমাজ-পরিবর্তনের অংশ।
উনিশ শতকের বাংলা নবজাগরণ সাধারণত ব্রিটিশ শাসনামলের সামাজিক, বৌদ্ধিক/ইন্টেল্যাক্চুয়াল, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত; এর সঙ্গে রাজা রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর, রানি রাসমণি, রবীন্দ্রনাথ প্রভৃতি নাম জড়িয়ে আছে।
বিদ্যাসাগর বিধবা-বিবাহ আন্দোলনের প্রধান মুখ ছিলেন এবং ১৮৫৬ সালের Hindu Widows’ Remarriage Act সেই সামাজিক বিতর্কের কেন্দ্রে দাঁড়ায়। অন্য দিকে, সুনীল এই বড় ঘটনার পাশে বসান এক শিশুর জন্ম, এক নারীর দাম্পত্য-অস্থিরতা, এক বাবুর অর্থশক্তি, এক তরুণ সমাজের স্বপ্ন—ফলে ইতিহাস কেবল কোনো বইয়ের অধ্যায় নয়, বরং মানুষের রক্তমাংসের গল্প হয়ে ওঠে।
৩. সেই সময় সারাংশ/ সামারি
প্রধান চরিত্রসমূহ
নবীনকুমার — উপন্যাসের কেন্দ্রীয় কাল্পনিক চরিত্র। রামকমল সিংহের পুত্র, একজন উচ্চবংশীয় বাঙালি যুবক, যিনি সেই উত্তাল সময়ের ঘূর্ণিতে পড়েন।
রামকমল সিংহ — নবীনকুমারের পিতা, একজন ধনী জমিদার ও বাবু। তাঁর তৃতীয় স্ত্রী বিষ্ণুবতী। তিনি কমলাসুন্দরী নামে একজন রক্ষিতা রাখেন।
বিষ্ণুবতী — রামকমলের স্ত্রী, নবীনকুমারের মা। একজন সহনশীল, দীর্ঘভোগী গৃহিণী।
দুলালচন্দ্র — নবীনকুমারের বন্ধু। সহজ-সরল, বিশ্বস্ত।
সেরাজিনী — একটি গুরুত্বপূর্ণ নারী চরিত্র, যিনি নবীনকুমারের জীবনে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েন।
কুসুমকুমারী — আরেকটি উল্লেখযোগ্য নারী চরিত্র।
গঙ্গানারায়ণ — নবীনকুমারের আত্মীয় বা পরিচিত, পরবর্তীতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
বিধুশেখর — একজন বিপ্লবী মনের মানুষ, যিনি উনিশ শতকের প্রগতিশীল আন্দোলনের সাথে যুক্ত।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত — ঐতিহাসিক কবি ও নাট্যকার, উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব চরিত্র।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর — সমাজসংস্কারক, বিধবাবিবাহ আন্দোলনের নেতা।
সেই সময় একক কোনো নায়কের জীবনী নয়; এটি উনিশ শতকের কলকাতা, বাংলার নবজাগরণ, ঔপনিবেশিক আধুনিকতা, সামাজিক সংস্কার, বাবু-সংস্কৃতি, নারীশিক্ষা, বিধবা-বিবাহ, নীলচাষী-শোষণ এবং জাতীয় চেতনার জন্মপূর্ব অবস্থার এক বৃহৎ উপন্যাস। লেখক নিজেই শেষের মন্তব্যে বলেন, এই কাহিনীর আসল নায়ক “সময়”।
তাই নবীনকুমার, গঙ্গানারায়ণ, বিন্দুবাসিনী, কুসুমকুমারী, সারোজিনী—সবাই ব্যক্তিগত মানুষ হলেও, তারা আসলে একটি যুগের ভাঙন, আলো, অন্ধকার এবং অসম্পূর্ণতার প্রতীক।
উপন্যাস শুরু হয় জোড়াসাঁকোর ধনী সিংহ পরিবারের গৃহে নবীনকুমারের জন্ম দিয়ে। রামকমল সিংহ ধনী জমিদার-বাবু; তাঁর স্ত্রী বিম্ববতী বহুদিন সন্তানহীন ছিলেন। এর আগেই দারিদ্র্যপীড়িত এক আত্মীয়-বিধবার ছেলে গঙ্গানারায়ণকে রামকমল ও বিম্ববতী দত্তক নিয়েছেন। গঙ্গা বুদ্ধিমান, শান্ত, পড়ুয়া এবং পরিবারের আশার কেন্দ্র। কিন্তু আকস্মিকভাবে বিম্ববতীর গর্ভে জন্ম নেয় নবীনকুমার। জন্মটি অসময়ে—মাত্র সাত মাস দশ দিনের গর্ভাবস্থার পর। নবীন এত ছোট, এত দুর্বল, আবার এত অদ্ভুত প্রাণশক্তিসম্পন্ন যে প্রথম থেকেই সে অলৌকিকতার আভা নিয়ে আসে।
রামকমল প্রথমে শিশুটিকে গ্রহণ করতে পারেন না, কারণ সন্তানের জন্মের সময় বিম্ববতীর জীবন বিপন্ন হয়। তাঁর মনে হয়, এই শিশুই যেন মাকে খেয়ে এসেছে। কিন্তু ধীরে ধীরে পিতৃস্নেহ, রক্তের টান এবং উত্তরাধিকারীর অহংকার তাঁকে বদলে দেয়। এখানেই একটি বড় দ্বন্দ্বের বীজ রোপিত হয়—দত্তক পুত্র গঙ্গানারায়ণ বনাম ঔরসজাত পুত্র নবীনকুমার। বিম্ববতী দুজনকেই সমান ভালোবাসতে চান; কিন্তু সমাজ, সম্পত্তি ও রক্তের ধারণা সেই সাম্যকে সহজে স্থায়ী হতে দেয় না।
নবীনকুমারের অলৌকিক জন্ম ও সিংহ পরিবার
কাহিনীর শুরুতেই আমরা দেখতে পাই কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিত্তশালী বাবু রামকমল সিংহ উড়িষ্যায় মহাল পরিদর্শনে গিয়েছেন। মহানদীর বুকে বজরার ওপর বসে তিনি জানতে পারেন তার স্ত্রী বিম্ববতী মুমূর্ষু। রামকমল ধরেই নিয়েছিলেন তার স্ত্রী আর বাঁচবেন না, তাই তিনি রক্ষিতা কমলাসুন্দরীকে জানিয়েছিলেন যে পৃথিবীর কোনো দ্রব্যেই তার আর সুখ হবে না। কিন্তু তিনদিন পর কলকাতায় ফিরে তিনি জানতে পারেন, বিম্ববতীর রোগ-যন্ত্রণা আসলে ছিল প্রসব-বেদনা। মাত্র সাত মাস দশ দিন গর্ভবাসের পর বিম্ববতী এক পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছেন।
এই নবজাতক ছিল অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও অদ্ভুত। সাহেব ডাক্তার সার্জেন গর্ডন ও কবিরাজ দীনদয়াল ভেষশাস্ত্রীর চিকিৎসায় বিম্ববতী ও তার সন্তান উভয়েই বেঁচে যান, যা এক প্রকার বিস্ময় ছিল। কুলপুরোহিত এই শিশুর কোষ্ঠি বিচার করে জানান যে, এই শিশুর যশোভাগ্য সাংঘাতিক এবং একদিন সারা দেশ তার সুনাম গাইবে।
শিশুর নাম রাখা হয় নবীনকুমার। নবীনকুমারের কিছু অলৌকিক ক্ষমতা ছিল; যেমন পাঁচ মাস বয়সে খাট থেকে পড়ে গিয়েও সে কাঁদেনি, বরং হামাগুড়ি দিয়ে পালঙ্কের নিচে লুকিয়ে হেসেছিল। আট মাস বয়সে সে নিজে থেকে উঠে দাঁড়ায় এবং কোনো পাখির বুলি না ফুটলেও, শিশু নবীনকুমার আট মাস সতেরো দিন বয়সে পরিষ্কার উচ্চারণে ‘রাধেকৃষ্ণ’ নাম উচ্চারণ করে সবাইকে চমকে দেয়।
দত্তক পুত্র গঙ্গানারায়ণের অন্তর্দ্বন্দ্ব
রামকমল ও বিম্ববতীর কোনো সন্তান না হওয়ায় তারা গঙ্গানারায়ণকে দত্তক নিয়েছিলেন। গঙ্গানারায়ণের আসল জন্মবৃত্তান্ত অত্যন্ত করুণ। রামকমলের পৈতৃক ভিটে হুগলি জেলার বাকসা-গ্রামে শ্রীশ্রীরঘুনাথ জীউ-এর মন্দিরে এক বিধবা রমণী ক্ষুধার জ্বালায় তার এক বছরের শিশুপুত্রকে ফেলে পালানোর চেষ্টা করেছিল।
ধরা পড়ার পর সে জানায়, পুত্রকে আহার জোগাতে না পেরে সে নিজে আত্মহত্যার মনস্থ করেছিল। এই রমণী ছিলেন রামকমলের এক সম্পর্কিত ভাইয়ের স্ত্রী। রামকমল তাদের কলকাতায় নিয়ে আসেন, কিন্তু ছয় মাস পরেই রমণীটি মারা যায় এবং বিম্ববতী ছেলেটিকে আপন করে নেন।
বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, গঙ্গানারায়ণের চেহারার সঙ্গে রামকমলের অদ্ভুত মিল ছিল, যার ফলে সমাজে গুঞ্জন ছিল যে গঙ্গা হয়তো রামকমলেরই কোনো উপপত্নীর সন্তান। হিন্দু কলেজে পড়ুয়া চোদ্দ বছরের কিশোর গঙ্গানারায়ণ অত্যন্ত লাজুক ও নিভৃতচারী। নবীনকুমারের জন্মের পর তার মনে এক চাপা অভিমান ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। রামকমলও নিজের ঔরসজাত সন্তানের প্রতি রক্তের টানে দুর্বল হয়ে পড়েন এবং সম্পত্তি ভাগের চিন্তায় পড়েন।
নবীনকুমার বড় হতে থাকে এক আশ্চর্য প্রতিভাধর শিশুর মতো। অকালপক্বতা তার চরিত্রের মূল চিহ্ন। সে খুব তাড়াতাড়ি হাঁটে, কথা বলে, গান করে, অভিনয় করে, লোককে আকর্ষণ করে। তার মধ্যে একদিকে শিশুসুলভ চাঞ্চল্য, অন্যদিকে অস্বাভাবিক দ্যুতি। এই অকালপক্বতা শুধু ব্যক্তিগত নয়; এটি বাংলার নবজাগরণেরও প্রতীক—যে সমাজ হঠাৎ দ্রুত আধুনিক হতে চাইছে, কিন্তু ভেতরে তার শিকড় দুর্বল, ভিত্তি অসম্পূর্ণ।
অন্যদিকে গঙ্গানারায়ণের জীবন এগোয় অন্য স্রোতে। সে হিন্দু কলেজের শিক্ষায় ইংরেজি সাহিত্য, যুক্তিবাদ, আধুনিক চিন্তা, রোমান্টিক আবেগের সংস্পর্শ পায়। সে অন্তর্মুখী, সংবেদনশীল, কিন্তু সামাজিক নিয়মের সামনে দুর্বল। তার জীবনের সবচেয়ে গভীর সম্পর্ক তৈরি হয় বিধুশেখরের বিধবা কন্যা বিন্দুবাসিনীর সঙ্গে। বিন্দু বাল্যবিধবা, কিন্তু বুদ্ধিমান, শিক্ষাপ্রিয়, আত্মসম্মানী। তার সংস্কৃত ও বাংলা পড়ার আগ্রহ আছে; কিন্তু সমাজ তাকে বলে, নারীকে এত পড়াশোনা মানায় না, বিশেষত বিধবাকে নয়। বিন্দুর মধ্যে যে মেধা ও কামনা—দুয়োকেই সমাজ পাপের নামে দমন করে।
গঙ্গানারায়ণ ও বিন্দুবাসিনীর সম্পর্ক উপন্যাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক প্রেমগুলোর একটি। তারা একে অপরকে চায়, কিন্তু বিধবা-শরীরকে সমাজ এমনভাবে পাপ, সংযম ও মৃত্যুর সঙ্গে বেঁধে দিয়েছে যে বিন্দু নিজের আকাঙ্ক্ষাকেও ভয় পায়। এক সময় গঙ্গা তাকে নিজের করে নিতে চাইলেও বিন্দু আত্মসমর্পণ করতে পারে না। তারা ধরা পড়ে; বিধুশেখর গঙ্গাকে শপথ করান বিন্দুকে আর না দেখার। বিন্দুকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় কাশীতে। এ যেন প্রেমের মৃত্যু নয়, সামাজিক মৃত্যুদণ্ড।
এরপর উপন্যাস বিস্তৃত হয় কলকাতার বৃহৎ সমাজে। নবীনকুমার যুবক হয়ে ওঠে। সে ধনী, উদার, বেপরোয়া, সাংস্কৃতিকভাবে উচ্চাভিলাষী। সে বিদ্যোৎসাহিনী সভা প্রতিষ্ঠা করে, নাটক করে, পত্রিকা-আলোচনা, সাহিত্যসভা, অনুবাদ, সমাজসংস্কার—সবকিছুতেই অর্থ ঢালে। মহাভারত প্রকাশের মতো বিরাট প্রকল্পে সে বিপুল অর্থ ব্যয় করে। বিধবা-বিবাহের পক্ষে দাঁড়ায়। বিদ্যাসাগরের কাজের সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়।
আবার একই সঙ্গে সে বাবু-আড়ম্বর, অপব্যয়, আবেগপ্রবণতা, নাটকীয়তা ও ব্যক্তিগত অসংযম থেকেও মুক্ত নয়। সে মহৎ, কিন্তু স্থির নয়; উদার, কিন্তু পরিকল্পনাহীন; আধুনিক, কিন্তু জমিদারি ব্যবস্থার সুবিধাভোগী।
এই দ্বৈততাই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় সত্য। নবীনকুমার বাংলা নবজাগরণের উজ্জ্বল মুখ, কিন্তু তার পেছনে আছে শোষিত গ্রাম, ক্ষুধার্ত কৃষক, নারীর অশ্রু, বিধবার দমবন্ধ জীবন, পতিতালয়ের অন্ধকার, ব্রিটিশ শাসনের দম্ভ, এবং উচ্চবিত্ত সংস্কারের সীমাবদ্ধতা। বইটি কোনো সরল প্রশস্তিগান নয়; বরং নবজাগরণের গৌরব ও ব্যর্থতা একসঙ্গে দেখায়।
গঙ্গানারায়ণের কাহিনী আবার অন্যভাবে চলতে থাকে। বিন্দুকে হারিয়ে সে ভেতরে ভেঙে যায়, সংসার থেকে দূরে সরে যায়। তার নিজের বাল্যবিবাহিত স্ত্রী লীলাবতী অবহেলিত থাকে; পরে তার মৃত্যু গঙ্গার জীবনে অপরাধবোধের আরেক স্তর যোগ করে।
দীর্ঘ উদ্দেশ্যহীন ঘুরাফেরা, সন্ন্যাসীসুলভ জীবন, কাশী-অনুসন্ধান—সব শেষে সে বিন্দুবাসিনীকে আবার খুঁজে পায়, কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। বিন্দু আর সেই ঘরের মেয়ে নেই; সে অপহরণ, যৌন-শোষণ, সামাজিক অপমান, মাতৃত্বহানি—সবকিছুর মধ্য দিয়ে বিধ্বস্ত। গঙ্গার সঙ্গে তার পুনর্মিলন এক তীব্র, ক্ষণিক, রাত্রির দৃশ্য।
বিন্দু বলে, এ জন্মে আর কিছু হলো না; যদি জন্মান্তর থাকে তবে সেখানে মিলন হোক। তারপর সে গঙ্গায় ঝাঁপ দেয়। গঙ্গাও ঝাঁপায়, কিন্তু তাকে আর পায় না। বিন্দুর মৃত্যু আসলে সমাজের হাতে বহু আগেই ঘটেছিল; নদীতে ঝাঁপ দেওয়া শুধু তার দৃশ্যমান পরিণতি।
পরবর্তী পর্যায়ে গঙ্গানারায়ণ কৃষক-সমস্যা, নীলচাষী আন্দোলন, গ্রামবাংলার শোষণ ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত হয়। নীলকরদের অত্যাচার, জমিদারি অবিচার, আদালত ও সংবাদপত্রের ভূমিকা, হরিশচন্দ্রের রাজনৈতিক সাংবাদিকতা, দীনবন্ধু মিত্রের নাট্য-বাস্তবতা—এসবের মধ্য দিয়ে উপন্যাস ব্যক্তিগত প্রেম থেকে জাতীয়-সামাজিক বোধে বিস্তৃত হয়। গঙ্গা ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত ক্ষত থেকে সামাজিক কাজে প্রবেশ করে, কিন্তু তার ভিতরে বিন্দুর স্মৃতি কখনো মুছে যায় না।
এই সময়ে কুসুমকুমারী প্রবেশ করে আরেক গুরুত্বপূর্ণ নারীচরিত্র হিসেবে। সে একসময় নবীনের পরিচিত ছিল; নবীন তাকে এক বিশেষ নামে মনে রাখে—“বনজ্যোৎস্না”। কুসুমের জীবনও সুখী নয়। তার বিবাহিত জীবন ভয়াবহ; স্বামী উন্মাদ, সহিংস। পরে সে বিধবা হয়। বিদ্যাসাগরীয় বিধবা-বিবাহ আন্দোলনের সূত্রে নবীন ও অন্যরা গঙ্গানারায়ণের সঙ্গে কুসুমকুমারীর বিবাহ ঘটায়। এই বিবাহ উপন্যাসে এক ধরনের আশার জায়গা—বিধবা-বিবাহ শুধু তত্ত্ব নয়, বাস্তব দাম্পত্যের সম্ভাবনাও তৈরি করতে পারে।
কিন্তু কুসুমকুমারীও একটি জটিল চরিত্র: সে বিন্দুর বিকল্প নয়, আবার নবীনের গোপন, অসম্পূর্ণ আকর্ষণেরও কেন্দ্র।
নবীনের নিজের দাম্পত্যও পূর্ণ নয়। তার প্রথম স্ত্রী কৃষ্ণভাবিনী অল্পবয়সে মারা যায়; পরে সারোজিনীর সঙ্গে তার বিবাহ। কিন্তু নবীন সংসারী মানুষ হিসেবে সফল নয়। তার উদারতা, সংস্কার, নাটক, সাহিত্য, সভা—সব আছে, কিন্তু ঘরের মানুষদের সম্পূর্ণভাবে পাওয়া নেই। সারোজিনী তাকে ভালোবাসে, কিন্তু সে সন্তানহীন, উদ্বিগ্ন এবং একদিন বিধবা হওয়ার মুখে দাঁড়িয়ে যায়।
উপন্যাসের শেষাংশে নবীনকুমারের পতন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়। তার অর্থ নিঃশেষিত হচ্ছে। সে অঢেল দান করেছে, বই ছেপেছে, সমাজসংস্কারে টাকা ঢেলেছে, কিন্তু নিজের জমিদারির প্রজাদের দুর্দশা বোঝেনি। এক পর্যায়ে নিজের গ্রামে বা জমিদারি অঞ্চলে গিয়ে সে এক নির্মম সত্যের মুখোমুখি হয়: শহরে সভা-সমিতিতে উদারতা দেখানো সহজ, কিন্তু গ্রামের কৃষকের ক্ষুধা, জমিদারি অত্যাচার, ভিটেমাটি হারানো মানুষের দিকে সে যথেষ্ট তাকায়নি।
এই সত্যের প্রতীকী চূড়ান্ত রূপ হলো ত্রিলোচন দাসের আক্রমণ। ত্রিলোচন একসময় জমিদারি অত্যাচারের শিকার কৃষক; তার ঘর পুড়েছে, পরিবার নষ্ট হয়েছে, জীবন উন্মাদনায় গিয়েছে। নবীন তাকে সাহায্য করতে এগোলে ত্রিলোচন পাগলের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে নবীনের বুকে কামড় বসায়। এই কামড় কেবল শারীরিক নয়; এটি শ্রেণিগত প্রতিশোধের চিহ্ন।
উপন্যাস যেন বলে—যে কৃষিজীবী সমাজের ওপর দাঁড়িয়ে শহুরে নবজাগরণ, সেই সমাজকে অবহেলা করলে তার ক্ষত একদিন উচ্চবিত্ত সংস্কারকের বুকেই ফিরে আসবে।
নবীনকে কলকাতায় আনা হয়। ক্ষত প্রথমে সামান্য মনে হলেও তা জটিল হয়ে ওঠে। তার জ্বর, রক্তক্ষরণ, বিভ্রম বাড়ে। মৃত্যুশয্যায় তার কাছে উপস্থিত হয় বন্ধুবান্ধব, চিকিৎসক, বিদ্যাসাগর, পরিবার। জ্বরের ঘোরে সে নিজের জীবনকে যেন টুকরো টুকরো করে দেখে: মহাভারত, বিধবা-বিবাহ, কৃষক, নারী, বন্ধুত্ব, ব্যর্থতা, মাতৃস্মৃতি, সারোজিনীর ভবিষ্যৎ, অদেখা পরবর্তী শতক—সব মিলিয়ে তার চেতনা ঝড়ের মতো ছুটে চলে।
শেষ মুহূর্তে কুসুমকুমারী তাকে ওষুধ দিতে আসে। নবীন তার মুখ দেখে পুরোনো নাম উচ্চারণ করে—“বনজ্যোৎস্না।” এটিই তার শেষ উচ্চারিত শব্দ। এরপর তার চেতনা স্তিমিত হয়; শরীর পরদিন ভোরে সম্পূর্ণ থেমে যায়।
এই শেষ শব্দের অর্থ বহুস্তরীয়। এটি শুধু কুসুমের প্রতি দমিত প্রেম নয়। “বনজ্যোৎস্না” তার কাছে সৌন্দর্য, কোমলতা, মাতৃত্ব, অনন্ত অপূর্ণতা, অদেখা আলো—সবকিছুর মিলিত রূপ। মৃত্যুর মুখে নবীন কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়, কোনো সভা-সংস্কারের নাম নয়, কোনো সম্পত্তির কথা নয়—এক রহস্যময় নারীমুখে জীবনের সৌন্দর্য ও অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষাকে চিনে নেয়।
নবীনের মৃত্যুর পর সারোজিনী অজ্ঞান হয়ে পড়ে, কুসুমকুমারী পাথরের মতো বসে থাকে। বিদ্যাসাগর, বিধুশেখর, গঙ্গা—সবাই এই মৃত্যুকে নিজের নিজের ব্যর্থতার আলোতে দেখে। বিধুশেখর, যিনি কঠোর, নিয়ন্ত্রক, প্রায় পাথরসম মানুষ, তিনিও নবীনকে দেখে ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, নবীন অপুত্রক, তাই মুখাগ্নি তিনিই করবেন। এই দৃশ্য এক যুগের পিতৃপ্রজন্মের পরাজয়ও দেখায়।
শেষে নবীনের দেহের নীচে রক্তমাখা এক অসমাপ্ত লেখা পাওয়া যায়। সেখানে নবীন নিজের সময়কে বিচার করেছে: সে না সম্পূর্ণ ভোগী হতে পেরেছে, না সম্পূর্ণ ত্যাগী; না পুরোনোতে ফিরতে পেরেছে, না নতুনকে পুরো বুঝতে পেরেছে। সে বুঝেছে, জাতি, ধর্ম, শিক্ষা, সাহিত্য—সবই অর্থহীন, যদি তা সকল মানুষকে না জোড়ে।
সে পরবর্তী শতক দেখতে চায়। সে বাঁচতে চায়। কিন্তু তার জীবন থেমে যায়। শেষ দৃশ্যে নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি প্রাণগোপাল সেই রক্তমাখা লেখা হাতে দাঁড়িয়ে থাকে, এবং ভবিষ্যৎ শতকের আলো কল্পনা করে।
শেষের ব্যাখ্যা
উপন্যাসের ending-এ নবীনকুমারের মৃত্যু আসলে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি এক অসম্পূর্ণ নবজাগরণের মৃত্যু। নবীন ছিল আলো, কিন্তু সেই আলো শহুরে, উচ্চবিত্ত, অস্থির এবং অসম্পূর্ণ।
সে বিধবা-বিবাহের জন্য লড়েছে, বাংলা সাহিত্যের জন্য অর্থ দিয়েছে, সভা করেছে, নাটক করেছে, বিদ্যাসাগরের পাশে দাঁড়িয়েছে—কিন্তু কৃষকের ক্ষুধা, জমিদারির সহিংসতা, সামগ্রিক জাতীয় মুক্তির প্রশ্নে সে দেরিতে জেগেছে। তাই ত্রিলোচনের কামড় তার বুকে জমে থাকা সামাজিক পাপের প্রতীক।
শেষের শহর-চিত্রে লেখক দেখান—কলকাতা আছে, গ্রাম আছে, ধর্ম আছে, ইংরেজ আছে, বাবু আছে, ব্রাহ্ম আছে, মিশনারি আছে, পতিতালয় আছে, সংবাদপত্র আছে; কিন্তু পূর্ণ অর্থে “দেশ” এখনো নেই। জাতীয় চেতনা তখনও জন্ম নিচ্ছে। কিছু আলোকবিন্দু জ্বলছে—শিক্ষা, নারীস্বাধীনতা, ভাষা, সাহিত্য, দারিদ্র্যচিন্তা, স্বাধীনতার অস্পষ্ট স্বপ্ন। নবীন সেই আলোগুলির এক উজ্জ্বল কিন্তু ক্ষণস্থায়ী প্রদীপ।
তাই সেই সময়–এর শেষ একসঙ্গে শোকময় ও আশাময়। নবীন মরে যায়, বিন্দু মরে যায়, অনেক স্বপ্ন ভেঙে যায়; কিন্তু প্রাণগোপালের চোখে যে ভবিষ্যৎ শতকের আলো ধরা পড়ে, তা জানায়—সময় থেমে থাকে না। ব্যক্তির মৃত্যু হয়, যুগের অসম্পূর্ণতা থেকে আরেক যুগ জন্মায়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাসের গভীরতা এখানেই: তিনি নবজাগরণকে শুধু গৌরবের মুকুট পরান না; তার রক্ত, অশ্রু, ভ্রান্তি, শ্রেণিগত অন্ধত্ব এবং অপূর্ণ মানবিকতার হিসাবও নেন।
৪. সেই সময় পর্যালোচনা
৪.১ সেই সময় চরিত্র সমূহ: নবীনকুমার ও তার সময়
নবীনকুমার বইটির কেন্দ্রীয় প্রতীক। তিনি শুধু ব্যক্তি নন; তিনি সম্পদ, প্রতিভা, বিলাস, দানশীলতা, ভোগ, সাংস্কৃতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং আত্মক্ষয়ের সমন্বয়।
কালিপ্রসন্ন সিংহের সঙ্গে তার ঐতিহাসিক সাদৃশ্য স্পষ্ট; কালিপ্রসন্ন নিজেও লেখক, অনুবাদক, সমাজসেবী ও দাতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন, এবং হুতোম প্যাঁচার নকশা উনিশ শতকের কলকাতার সমাজকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে ধরেছিল।
রামকমল সিংহ:
এক গতানুগতিক জমিদার নয়। তিনি সংস্কার ও ভোগের মধ্যে দোদুল্যমান। ইংরেজি শিক্ষাকে গ্রহণ করেন, নিজ সন্তানকে হিন্দু কলেজে পাঠান, কিন্তু রক্ষিতা কমলাসুন্দরীর জন্য আলাদা বাড়ি করেন। তাঁর মৃত্যুর পর পরই বোঝা যায়—তিনি কাউকে পুরোটা দিতে পারেননি; তাঁর সম্পত্তি উত্তরসূরিদের মধ্যে যুদ্ধের বীজ বুনে যায়।
গঙ্গানারায়ণ সিংহ: দত্তক পুত্র। বাল্যবিবাহের শিকার। তিনি ইংরেজি ও সংস্কৃত উভয় সাহিত্যে অনুরাগী, কিন্তু সমাজের জঞ্জাল তাকে বাঁধে। বিন্দুবাসিনীর প্রতি তার ভালোবাসা একসময় হয়ে ওঠে একধরনের নীরব বিপ্লব।
উপন্যাসের শেষভাগে তিনি বিধুশেখরের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে কমলাসুন্দরীকে উচ্ছেদ করতে বাধা দেন—এটাই যেন তার চরম পরিণতির ইঙ্গিত। রামকমল সিংহের রক্ত না থাকলেও তিনি জমিদারির ভার নেন, যেন রক্তের চেয়ে শিক্ষা ও ন্যায়বোধ বড়।
বিন্দুবাসিনী: উপন্যাসের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী চরিত্র। অল্প বয়সে বিধবা, পাঠে আগ্রহী, কিন্তু সমাজের রীতিনীতি তাকে ঘরের কোণে ঠেলে দেয়। গঙ্গানারায়ণের প্রেম সে প্রত্যাখ্যান করে—অথচ মন তার দোলায়। অবশেষে বিধুশেখর তাকে কাশীতে পাঠিয়ে দেন। বিন্দুর চোখের জল আর নীরব কান্না সেই সময়-এর সবচেয়ে বেদনাদায়ক দৃশ্য।
“বিন্দু চোখ মুছল। তারপর সে দেখল মেঝেতে কয়েকটি জলের ফোঁটা। কিছু না চিন্তা করে বিন্দু লোভের মতন সেই জল চাটতে লাগল।”
একাদশীতে উপবাসরত বিধবার নিজের চোখের জল খাওয়ার করুণ দৃশ্য—যা বাঙালি উপন্যাসে বিরল।
বিধুশেখর: আইনজীবী, বাস্তববাদী, কাঠিন্যহৃদয়। তিনি ‘দক্ষ’ কিন্তু নিষ্ঠুর। গঙ্গানারায়ণকে তিনি রক্ষা করেন, আবার বিন্দুকে নির্বাসিত করে তাকে নিঃস্ব করে দেন। ভাইপো মধুর খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ তাকে কাঁপিয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত তিনি আত্মীয়তার টানে গঙ্গানারায়ণের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে থাকেন—বাস্তবতার জয় হয়, কিন্তু মানবিকতার পতন ঘটে।
মধু (রাজনারায়ণ দত্তের পুত্র): পাশ্চাত্যমোদী, গরুর মাংস খায়, মদ পান করে, ইংরেজি কবিতা লেখে এবং খ্রিস্টান হয়। সে একটি প্রতীক: সেই সময়-এর তরুণ প্রজন্ম যারা ইংরেজি শিক্ষায় চিরকাল বিদেশি থাকে, কিন্তু মাতৃভূমির টান হারায়। প্রতিভা ও আত্ম-বিপর্যয়ের এক জটিল চরিত্র। তাঁর মধ্যে বাঙালি আধুনিকতার আকাঙ্ক্ষা আছে, আবার ইউরোপীয় মায়া, আত্মমুগ্ধতা, আর্থিক বিপর্যয় ও দারুণ এক করুণাও আছে।
বিদ্যাসাগর বইতে নৈতিক দৃঢ়তার প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি শুধু সংস্কারক নন; তিনি যুক্তিবাদী মানবিকতার প্রতীক। বিধবা-বিবাহের প্রশ্নে তার অবস্থান সমাজের নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে মানুষের মর্যাদার পক্ষে দাঁড়ায়।
নারী চরিত্ররা—বিশ্ববতী, অন্তঃপুরের স্ত্রীলোক, বিধবা, বালিকা, গৃহবন্দি নারী—এই উপন্যাসের নীরব কিন্তু গভীরতম রাজনৈতিক স্তর তৈরি করে। সচরাচর যেখানে ইতিহাস পুরুষদের নামে লেখা হয়; সেখানে সেই সময় দেখায়, সমাজের সত্যিকারের যন্ত্রণা প্রায়ই নারীর দেহ, বিবাহ, মাতৃত্ব ও বন্দিত্বের ওপর লেখা থাকে।
৪.২ সেই সময় বিষয়বস্তু
বিষয়বস্তু ১: শিক্ষা বনাম সংস্কার উপন্যাসে হিন্দু কলেজ, সংস্কৃত কলেজ, ইংরেজি শিক্ষার দ্বান্দ্বিকতা বারবার উঠে এসেছে। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের তত্ত্ববোধিনী সভা আর বীটনের স্ত্রীশিক্ষার আগ্রহ—একই সিকির দুই পিঠ। গঙ্গানারায়ণ শেকসপিয়র পড়ে, আবার বিন্দুকে উপনিষদ শোনায়। মধু ইংরেজি কবিতা লেখে, কিন্তু বিদ্যাসাগর তাকে কটাক্ষ করেন কেন মাতৃভাষায় লেখে না।
“বাঙালা ভাষা সাহিত্য রচনার উপযোগী নয়। ইহা অতি কদর্য ও ইত্যাদি।”
মাইকেলের এই বক্তব্য সেই সময়ের বাঙালি মধ্যবিত্তের আত্মবিধ্বংসী মানসিকতাকে চিহ্নিত করে।
বিষয়বস্তু ২: নারীর অবস্থান উপন্যাসের স্ত্রীচরিত্ররা—বিশ্ব্বতী, বিন্দুবাসিনী, কমলাসুন্দরী, থাকামণি, সোহাগবালা—সবাই কোনো-না-কোনোভাবে নিপীড়িত। বিশ্ব্বতী স্বামীর গৃহে রাণী, কিন্তু তাকে শাসন করতে হয় দাসীদের।
বিন্দু বিধবা, সুশিক্ষিতা, অথচ তাকে ভিখারির মতো কাশীতে পাঠানো হয়। কমলাসুন্দরী রক্ষিতা, কিন্তু রামকমলের মৃত্যুর পর তাকে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা হয়। থাকামণি দরিদ্র চাষার স্ত্রী, কলকাতায় এসে ধনীর ভৃত্যমহলে যৌন নির্যাতনের শিকার।
বিষয়বস্তু ৩: জমিদারি ও শোষণ গঙ্গানারায়ণ যখন চাষিদের সঙ্গে নীলচাষের দাদন নিয়ে মীমাংসা করতে যান, তখন বিধুশেখর চান ব্রিটিশ ইজারাদারদের সঙ্গে হাত মেলাতে। গঙ্গানারায়ণ চাষিদের পক্ষে রায় দেন—উপন্যাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক মুহূর্ত।
বিষয়বস্তু ৪: পারিবারিক বিদ্রোহ: মধুর বাবা রাজনারায়ণ দত্ত অত্যন্ত বিলাসী ও বিত্তবান। তিনি ছেলের সব আবদার মেটান। কিন্তু মধু আট-নয় বছরের এক বালিকাকে বিবাহ করার পারিবারিক সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে। সে বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে গিয়ে বাড়ি ছাড়ার হুমকি দেয়।
বিষয়বস্তু ৫: বন্ধুত্ব ও গৌরের প্রতি প্রেম: মধু তার বন্ধু গৌরদাস বসাককে (গৌর) পাগলের মতো ভালোবাসতো। সে গৌরের জন্য ফরাসি কোম্পানির পমেটম ও ল্যাভেন্ডার এনে দেয় এবং তাকে নিয়ে অ্যাক্রোসটিক (Acrostic) কবিতা লেখে।
বিষয়বস্তু ৬: হিন্দু ধর্ম ও ভাষার প্রতি অনীহা: মধু বাংলা ভাষাকে ‘চাকর-বাকরদের ল্যাঙ্গুয়েজ’ বলে তাচ্ছিল্য করে এবং সংস্কৃতকে ‘বামুন বামুন গন্ধ’ যুক্ত বলে মন্তব্য করে। সে মনে করে, ইংরেজদের মতো শক্তিশালী হতে গেলে গোমাংস (Beef) এবং মদ্যপান (Wine) অপরিহার্য।
বন্ধুদের সে খাসির কাবাব খাইয়ে গোমাংস বলে ভয় দেখায়। তবে গৌরের চ্যালেঞ্জের মুখে সে তৎক্ষণাৎ বাংলা ভাষায় একটি নিখুঁত কবিতা রচনা করে প্রমাণ করে দেয় যে তার মেধা অসীম
৫. মূল্যায়ন
আমার অনুভূতি এক বাক্যে:
সেই সময় নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্যের একটি অসাধারণ, যুগান্তকারী ও মর্মস্পর্শী উপন্যাস, যা আমাকে একাধিকবার কাঁদিয়েছে, ভাবিয়েছে এবং ইতিহাসকে সম্পূর্ণ নতুন চোখে দেখতে শিখিয়েছে।
সেই সময়’র শক্তিশালী দিক:
- চরিত্র নির্মাণ অসাধারণ: প্রতিটি চরিত্র স্বতন্ত্র, নিজস্ব মত ও দ্বিধা নিয়ে বাঁচে।
- ঐতিহাসিক নির্ভুলতা: বিদ্যাসাগর, দেবেন্দ্রনাথ, মাইকেলের সংলাপ পর্যন্ত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় অধ্যবসায়ের সঙ্গে এঁকেছেন।
- ভাষা: গদ্যে কখনও প্যাথোস, কখনও তীব্র ব্যঙ্গ, কখনও দার্শনিক গাম্ভীর্য—বই পড়তে পড়তে মনে হয় যেন বাঙালির মর্মকথা পড়ছি।
- স্ত্রীচরিত্রদের প্রতি লেখকের সহানুভূতি: বিন্দু, থাকামণি, কমলা কেউই একমাত্রিক নন; তাদের ভুল, দুর্বলতা, স্বপ্ন আছে।
সেই সময়’র দুর্বল দিক
- কিছু কিছু জায়গায় গতি অত্যন্ত মন্থর; বিশেষ করে জমিদারি লেনদেন ও দলিল-দস্তাবেজের অংশ আধুনিক পাঠকের জন্য ক্লান্তিকর।
- কিছু কিছু সাবপ্লট অমীমাংসিত রয়ে গেছে—যেমন থাকামণির পুরোটা আরেকটি উপন্যাস হতে পারত, কিন্তু এখানে খুব দ্রুত সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
প্রভাব ও বিতর্ক:
বইটি প্রকাশের পর ‘ঐতিহাসিক উপন্যাসে কল্পনার স্বাধীনতা’ নিয়ে বিতর্ক হয়। কেউ কেউ বলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় রামমোহন রায়কে এড়িয়ে গেছেন, আবার কেউ বলেন তিনি রক্ষণশীলদের মনস্তত্ত্ব বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: সেই সময় পাঠকের মনে গেঁথে যায় দীর্ঘ দিন।
সেই সময়’র মতো বই
শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সাতসমুদ্র তেরো নদী’ এবং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘প্রথম আলো’র মতো। কিন্তু ‘প্রথম আলো’ নবজাগরণের ভোরবেলার গল্প, সেই সময় একটু পরে—যখন সেই আলোর প্রতিফলন ভাঙাচোরা দেয়ালে পড়ছে।
৬. সমসাময়িক গুরুত্ব: আজকের পাঠকের জন্য ৫টি শিক্ষা
আজকের পাঠকের জন্য সেই সময় বিশেষভাবে দরকার, কারণ তা আমাদের দেখিয়ে দেয় যে নৈতিক সাহস ব্যতিত শিক্ষা অসম্পূর্ণ। উপন্যাসটি পড়তে পড়তে বারবার মনে হয়—আমরা কি সত্যিই সেই সময় থেকে বেরিয়ে এসেছি?
৫ শিক্ষা:
১. সমাজ-সংস্কার কেবল আইন নয়; মানুষের ভিতরের ভয় বদলানোও জরুরি।
২. শিক্ষা যদি নারীকে মুক্ত না করে, তবে তা অসম্পূর্ণ আধুনিকতা।
৩. সম্পদ ও প্রতিভা চরিত্রকে বাঁচায় না, যদি নৈতিক সংযম না থাকে।
৪. ইতিহাসকে শুধু তারিখ দিয়ে নয়, মানুষের গল্প দিয়ে বুঝতে হয়।
৫. গঙ্গানারায়ণ সংস্কৃত, ইংরেজি ও দর্শন পড়ে সিদ্ধান্ত নেয় বাণিজ্যে ইংরেজদের অবাধ প্রতিযোগিতা না দিয়ে চাষিদের পাশে দাঁড়াবে। আজকের শিক্ষার্থীকে শেখায়—মুখস্থ বিদ্যা নয়, বিবেকবান হওয়া দরকার।
৭. উপসংহার
সেই সময় কখনো নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার বই নয়। এটি সেই বিরল বই, যা পড়ার পর আপনি নিজের চারপাশকে আরও স্পষ্ট দেখতে শুরু করেন। সমাজের উন্নতির মুখোশের নিচে চাপাপড়া বেদনাগুলো যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
সেই সময় আমার ব্যক্তিগত পাঠতালিকায় “২০ সেরা বাংলা বই”-এর একটি হিসেবে থাকবে—কারণ এটি শুধু অতীতকে পুনর্গঠন করে না, আমাদের বর্তমানকেও প্রশ্ন করে। যারা বাংলা ঐতিহাসিক উপন্যাস, সমাজ-সংস্কার, নবজাগরণ, চরিত্রকেন্দ্রিক বিস্তৃত বর্ণনা এবং ইতিহাসের মানবিক পাঠ ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য এটি অবশ্যপাঠ্য।
আরও পড়ুন: পূর্ব-পশ্চিম রিভিউ: দেশভাগের ক্ষত, শিকড়হারা বাঙালি ও ঘরহারার ইতিহাস | কালবেলা রিভিউ: নকশাল স্বপ্নের ভাঙা শরীর ও মাধবীলতার অবিনশ্বর প্রেম






