কেন আমরা বিশ্বাস করি, অথচ খুব কম সময়েই জিজ্ঞেস করি—আমি যা বিশ্বাস করছি, তা সত্য কিনা? আমি পাঠকদের বলব, *আরজ আলী মাতুব্বর রচনাসমগ্র-১ শুধু একটি বই নয়; এটি নিজের চিন্তাকে নিজের সামনে দাঁড় করানোর এক কঠিন, দরকারি এবং মুক্তিকামী অভিজ্ঞতা।
বইটি কাদের জন্য
এই বই তাঁদের জন্য, যারা ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান, সমাজ, কুসংস্কার, আত্মা, ঈশ্বর, পরকাল, মানুষ ও প্রকৃতি নিয়ে ভয়ের বদলে প্রশ্ন করতে চান তাদের জন্য। যারা কেন? প্রশ্নকে বিদ্রোহ নয়, জ্ঞানের শুরু মনে করেন, তাঁরা এই বই থেকে গভীরভাবে উপকৃত হবেন। বিশেষভাবে, বাংলা গদ্যরচনা নন-ফিকশন, দর্শন, মুক্তচিন্তা, যুক্তিবাদ, মানবতাবাদ, বিজ্ঞানমনস্ক সাহিত্য এবং ধর্মীয় সমালোচনামূলক পড়তে আগ্রহী পাঠকদের জন্য বইটি জরুরি।
যারা প্রশ্নহীন আনুগত্যকে শান্তি মনে করেন, যারা ধর্মীয় বা সামাজিক বিশ্বাসকে যুক্তিপরীক্ষার বাইরে রাখতে চান, অথবা যারা বই থেকে শুধু বিনোদন প্রত্যাশা করেন—তাঁদের কাছে এই বই অস্বস্তিকর লাগতে পারে। তবে, অন্যদিকে, অস্বস্তিই অনেক সময় চিন্তার দরজা খুলে দেয়। আরজ আলী মাতুব্বরের বই সেই দরজা খুলতে বাধ্য করে।
১. ভূমিকা: বইটি কী, কেন পড়বেন
আরজ আলী মাতুব্বর রচনাসমগ্র-১ হলো বাংলাদেশের স্বশিক্ষিত দার্শনিক, মানবতাবাদী ও যুক্তিবাদী চিন্তক আরজ আলী মাতুব্বরের প্রথম খণ্ডের রচনাসংকলন। বইটি ১৯৯৬ খ্রীষ্টাব্দে প্রথম প্রকাশিত হয় ।
এই খণ্ডে প্রধানভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে সত্যের সন্ধান, অনুমান, স্মরণিকা, বেদ-এর অবদান, এবং কয়েকটি অপ্রকাশিত বা অসমাপ্ত অংশ—যেমন ভাবি প্রশ্ন, না-বুঝের প্রশ্ন, টুকিটাকি, আমার জীবনদর্শন, চিঠি ও আলোকচিত্র।
সংক্ষেপে বললে, আরজ আলী মাতুব্বর রচনাসমগ্র-১ এমন একটি বই যেখানে ধর্ম, আত্মা, ঈশ্বর, পরকাল, ভাগ্য, পাপ-পুণ্য, প্রকৃতি, পুরাণ ও সমাজকে অন্ধভাবে গ্রহণ না করে প্রশ্নের সামনে দাঁড় করানো হয়েছে।
সাধারণত যেখানে কোনো ধর্মীয় বই এসরে উত্তর দেয়, সেখানে এই বই এসব নিয়ে প্রশ্ন করে। সাধারণত সমাজ মানুষকে মানতে শেখায়; এই বই মানুষকে ভাবতে শেখায়। সাধারণত কুসংস্কারের ভয়কে ব্যবহার করে; এই বই ভয়কে ভাঙতে চায়।
আরজ আলী মাতুব্বরের লেখার শক্তি তাঁর ভাষার সরলতায়।
তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের দার্শনিক ভাষায় লেখেন না; তিনি গ্রামীণ বাংলার ভাষায় এমন প্রশ্ন তোলেন, যা দর্শন, ধর্মতত্ত্ব, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং মানব বিদ্যার কেন্দ্রে গিয়ে লাগে। তাঁর চিন্তা ঔপনিবেশিক বাংলার শেষপর্ব, পাকিস্তান আমল, এবং স্বাধীন বাংলাদেশের সামাজিক পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে গড়ে উঠেছে।
বইটির প্রধান উদ্দেশ্য হলো—সত্যকে জানতে হলে প্রশ্ন করতে হবে; কোনো বিশ্বাস, আচার, পুরাণ বা ধর্মীয় দাবি শুধু প্রচলিত বলেই সত্য নয়।
২. ভূমিকা: আরজ আলীর প্রশ্নের জন্ম কোথায়?
আরজ আলী মাতুব্বর জন্মগ্রহণ করেন ১৭ ডিসেম্বর ১৯০০ সালে বরিশালের চরবাড়িয়া লামচরিতে এবং মৃত্যুবরণ করেন ১৫ মার্চ ১৯৮৫ সালে।
রচনাসমগ্র-৩-এর “ভিখারীর আত্মকাহিনী” অংশে তাঁর জন্মভূমির প্রসঙ্গে পরিষ্কারভাবে চরবাড়িয়া/লামচরির গ্রামীণ পরিবেশ উঠে আসে। বইয়ের ভেতরের ভাষা থেকেই বোঝা যায়, তাঁর দর্শন কোনো আরামদায়ক পাঠাগারের জন্ম নয়; এটি মাঠ, নদী, অভাব, লোকবিশ্বাস, সামাজিক অপমান এবং অসামান্য কৌতূহলের ভিতর জন্ম নেওয়া দর্শন।
রচনাসমগ্র-৩-এর “নিবেদন” অংশে তাঁকে বলা হয়েছে: “একজন বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ”, “যুক্তি, মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তচিন্তার এক অনন্য মানুষ”। এই ছোট বাক্যগুলোই তাঁর পরিচয়ের কেন্দ্র। তিনি প্রচলিত ধর্মীয়, সামাজিক বা দার্শনিক মতকে শুধু অস্বীকার করেননি; বরং প্রশ্ন করেছেন—কোনো দাবি সত্য হলে তার যুক্তি কোথায়, প্রমাণ কোথায়, মানুষের কল্যাণে তার ভূমিকা কী?
আরজ আলী মাতুব্বরের বড় রচনাগুলোর মধ্যে আছে সত্যের সন্ধান, সৃষ্টি রহস্য, অনুমান, মুক্তমন, ম্যাকগ্লাশন চুলা, এবং আত্মজীবনীমূলক ভিখারীর আত্মকাহিনী। তাঁর কাজের মধ্যে গ্রামীণ বাস্তবতা ও বিশ্বদর্শনের এক বিরল মিশ্রণ আছে। তিনি কেবল “বিশ্বাস করো না” বলেন না; তিনি বলেন—দেখো, ভাবো, যাচাই করো, মানুষের দিকে তাকাও।
আরজ আলী মাতুব্বরকে বোঝার জন্য তাঁর জীবনের একটি ব্যক্তিগত আঘাত মনে রাখা জরুরি। বইয়ের প্রারম্ভিক অংশে উল্লেখ আছে, মায়ের মৃত্যুর পর মায়ের ছবি তোলার কারণে সমাজের ধর্মীয় কর্তৃত্বের একাংশ জানাজা ও দাফন নিয়ে আপত্তি তোলে। প্রারম্ভিক স্মৃতিচিত্রে বলা হয়েছে, মায়ের মৃত্যুর পর ছবি তোলার দায়ে মৃতদেহ কেউ জানাজা পড়ে দাফন করতে রাজি হয়নি।
প্রথমে, ঘটনাটি ব্যক্তিগত শোকের মতো মনে হতে পারে। কিন্তু গভীরে গেলে বোঝা যায়, এখানেই আরজ আলীর বুদ্ধিবৃত্তিক জন্ম। তিনি প্রশ্ন করেন: ধর্ম যদি মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল না হয়, তবে সেই ধর্মীয় ব্যাখ্যা কতটা সত্য? মায়ের প্রতি ভালোবাসা, মৃত্যুর মর্যাদা, মানবিক সহমর্মিতা—এসবের চেয়ে কি কোনো আচার বড়?
যা তাঁর জীবনে বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে। তিনি শুধু রাগ করেননি; তিনি পড়েছেন। তিনি শুধু প্রতিবাদ করেননি; তিনি অনুসন্ধান করেছেন। বইয়ের প্রথমদিকের আলোচনায় তাঁর ধর্ম, দর্শন ও বিজ্ঞানগ্রন্থ পাঠের কথা উল্লেখ আছে।
অন্যভাবে বললে, তাঁর যুক্তিবাদ বইপড়া অহংকার থেকে নয়; অপমান, শোক, সামাজিক নিষ্ঠুরতা এবং সত্যের প্রয়োজন থেকে জন্মেছে।
আরজ আলী মাতুব্বরের চিন্তার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো: তিনি ধর্মকে শুধু আচার হিসেবে দেখেন না; তিনি ধর্মীয় দাবির যুক্তিগত গঠন পরীক্ষা করেন। ঈশ্বর সর্বশক্তিমান হলে ফেরেশতা কেন? আত্মা দেহ ছাড়লে জানে কীভাবে? পাপ-পুণ্যের হিসাব ঈশ্বর জানলে ডায়েরি কেন? মানুষ ভাগ্যনির্ধারিত হলে পাপের দায় কার? এসব প্রশ্ন শিশুসুলভ সরল মনে হলেও এগুলো গভীর দর্শন।
৩. রচনাসমগ্র-১ এর সারাংশ
সূচিপত্র অনুযায়ী রচনাসমগ্র-১-এর প্রধান অংশগুলোকে কয়েকটি স্তরে পড়া যায়।
প্রথম স্তর হলো সত্যের সন্ধান। এখানে ছয়টি প্রধান প্রস্তাব রয়েছে: আত্মা বিষয়ক, ঈশ্বর বিষয়ক, পরকাল বিষয়ক, ধর্ম বিষয়ক, প্রকৃতি বিষয়ক, এবং বিবিধ।
দ্বিতীয় স্তর হলো অনুমান। এখানে রাবণ, ফেরাউন, ভগবান, আধুনিক স্বর্গ, মেরাজ, শয়তানের জবানবন্দি—এসব বিষয়কে প্রচলিত ধর্মীয় বা পৌরাণিক ব্যাখ্যার বাইরে গিয়ে নতুনভাবে পড়া হয়েছে।
তৃতীয় স্তর হলো অপ্রকাশিত ও অসমাপ্ত অংশ। যেমন বেদ-এর অবদান, ভাবি প্রশ্ন, না-বুঝের প্রশ্ন, টুকিটাকি, আমার জীবনদর্শন। এগুলো লেখকের কাঁচা প্রশ্ন, অসমাপ্ত চিন্তা এবং ব্যক্তিগত বৌদ্ধিক বিবর্তন বুঝতে সাহায্য করে।
তাই, বইটি কেবল এক পরিশোধিত প্রবন্ধের সংকল নয়; এটি একজন স্বশিক্ষিত মানুষের চিন্তার কর্মশালা। এখানে যেমন রয়েছে চুড়ান্ত উত্তর, তেমনি আছে প্রশ্নের খসড়া, অসমাপ্ততা, সন্দেহ, পুনর্বিবেচনা।
৪. “সত্যের সন্ধান”: প্রশ্নের ভিতর দিয়ে জ্ঞানের শুরু
সত্যের সন্ধান বইটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে আরজ আলী মাতুব্বর “অজানাকে জানার স্পৃহা” থেকে মানুষের জিজ্ঞাসাকে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর ভাষায়, মানুষ “কি” ও “কেন”-এর অনুসন্ধান করতে করতে বিজ্ঞানের অটল সৌধ গড়ে তুলেছে।
এই ছোট বক্তব্যে তাঁর সম্পূর্ণ epistemology বা জ্ঞানতত্ত্ব লুকিয়ে আছে। মানুষ জানে না বলেই প্রশ্ন করে; প্রশ্ন করে বলেই পরীক্ষা করে; পরীক্ষা করে বলেই জ্ঞান তৈরি হয়। সুতরাং, প্রশ্ন ধর্মের শত্রু নয়; প্রশ্ন অজ্ঞতার শত্রু।
তিনি আরও জিজ্ঞেস করেন: “সত্যতা বিচারের মাপকাঠি” কী, “সত্যতা প্রমাণের উপায়” কী, এবং “সত্যের রূপ” কী? এই তিনটি প্রশ্ন আধুনিক philosophy of truth-এর কেন্দ্রীয় প্রশ্নের সঙ্গে মিলে যায়। কিন্তু আরজ আলী সেগুলোকে কোনো একাডেমিক বিশিষ্টার্থক শব্দে বা ভাষায় প্রকাশ করেন না। তিনি সাধারণ মানুষের ভাষায় বলেন: সব কথা সত্য হতে পারে না; সত্য যাচাইয়ের উপায় থাকতে হবে।
অন্যদিকে, ধর্মীয় জনগোষ্টি সাধারণত উত্তর আগে দেয়, প্রশ্ন পরে নিতে চায়। আরজ আলী তার বিপরীত। তিনি উত্তর নয়, প্রশ্নকে অগ্রাধিকার দেন। ফলে সত্যের সন্ধান এক ধরনের প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা হয়ে উঠে —যেখানে মুখস্থ উত্তর নয়, যুক্তিগত অস্বস্তি শেখানো হয়।
৫. আত্মা বিষয়ক: “আমি কে?”—বাংলা দর্শনের সহজতম কঠিন প্রশ্ন
প্রথম প্রস্তাব শুরু হয় “আমি কে?” প্রশ্ন দিয়ে। এই প্রশ্ন একদিকে অত্যন্ত সাধারণ, অন্যদিকে দর্শনের সবচেয়ে জটিল প্রশ্নগুলোর একটি। মানুষ যখন “আমি” বলে, তখন সে কাকে বোঝায়—শরীর, প্রাণ, মন, চেতনা, না আত্মা?
আরজ আলী এখানে শরীর, প্রাণ, মন ও আত্মার সম্পর্ক নিয়ে ধারাবাহিক প্রশ্ন করেন। যদি আত্মা দেহের বাইরে স্বাধীন সত্তা হয়, তাহলে তার প্রমাণ কী? যদি দেহ মরে যায় কিন্তু আত্মা থাকে, তবে দেহের ইন্দ্রিয় ছাড়া সে জানে কীভাবে? যদি মন ও প্রাণ এক হয়, তবে ঘুম বা অজ্ঞান অবস্থায় মন কোথায় থাকে?
এখানে তিনি সরাসরি ধর্মকে অস্বীকার করার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন: তিনি ধর্মীয় ভাষার অস্পষ্টতাকে প্রদর্শন করেন । আত্মা এমন একটি ধারণা যার ওপর পরকাল, পাপ-পুণ্য, স্বর্গ-নরক, বিচার—সব দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সেই আত্মা কী, তা যদি স্পষ্ট না হয়, তাহলে পুরো ধর্মীয় নৈতিক কাঠামোই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
অন্য অর্থে, আরজ আলী mind-body problem-কে বাংলার মাটিতে নামিয়ে আনেন। তিনি ডেকার্টের মতো "I think, therefore I am" “আমি মনে করি, তাই আমি আছি” বলেন না; তিনি বলেন, “আমি কে?”—এবং সেই প্রশ্নের ভিতর দিয়ে আত্মা-তত্ত্বকে যুক্তির পরীক্ষায় তোলেন।
৬. ঈশ্বর বিষয়ক: সর্বশক্তিমান ধারণার যুক্তিগত চাপ
দ্বিতীয় প্রস্তাবের কেন্দ্রে আছে প্রশ্ন: “আল্লাহর রূপ কি?” তিনি দেখান, ঈশ্বরকে একদিকে নিরাকার, সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ, সর্বব্যাপী বলা হয়; অন্যদিকে ধর্মীয় ভাষায় তাঁকে দেখা, শোনা, রাগ করা, খুশি হওয়া, আদেশ দেওয়া, দূত পাঠানো, আরশে থাকা—এসব মানবিক গুণে বর্ণনা করা হয়।
প্রথমে, এটি রূপক মনে হতে পারে।
তবে আরজ আলী জিজ্ঞেস করেন, রূপক বিশ্বাস যদি literal belief বা আক্ষরিক বিশ্বাস হয়ে উঠে, তখন সমস্যার সমাধান হয় কীভাবে? ঈশ্বর যদি সর্বজ্ঞ হন, তবে ফেরেশতার সংবাদ কেন? ঈশ্বর যদি সর্বশক্তিমান হন, তবে এত মধ্যস্থতাকারী কেন? ঈশ্বর যদি সর্বত্র থাকেন, তবে তাঁর কাছে যাওয়া বা তাঁর কাছ থেকে আসার অর্থ কী?
এই অধ্যায়ে তাঁর পদ্ধতি শুধু ধর্মতত্ত্ব নয়; ভাষাতত্ত্বও। তিনি শব্দ ধরে প্রশ্ন করেন। “রূপ”, “স্থান”, “দূত”, “জানা”, “দেখা”, “শোনা”—এসব শব্দ ঈশ্বরের ক্ষেত্রে কীভাবে অর্থ পায়? এই প্রশ্নগুলো বিশ্বাসী পাঠককেও ভাবায়, কারণ পরিণত বিশ্বাস নিজের ভাষাগত সীমাবদ্ধতাকে বোঝে।
৭. পরকাল বিষয়ক: পাপ-পুণ্য, বিচার ও মহাজাগতিক আমলাতন্ত্র
তৃতীয় প্রস্তাবের শুরুতে প্রশ্ন: “জীব সৃষ্টির উদ্দেশ্য কি?” এই প্রশ্ন শুধু ধর্মীয় নয়; এটি নৈতিক, অধিবিদ্যামূলক এবং অস্তিত্বগত। মানুষ যদি ঈশ্বরের নাম গুণ কীর্তনের জন্য সৃষ্টি হয়, তবে প্রাণিজগতের অন্য জীবের উদ্দেশ্য কী? যদি পাপ-পুণ্যের হিসাব থাকে, তবে সেই হিসাব কে রাখে? ঈশ্বর যদি সব জানেন, তবে ফেরেশতার ডায়েরি কেন?
এখানে আরজ আলী পরকাল ধারণাকে আবেগ দিয়ে নয়, প্রশাসনিক যুক্তি দিয়ে বিচার করেন। স্বর্গ-নরক, বিচার, পুরস্কার, শাস্তি—এসব ধারণা এক ধরনের cosmic bureaucracy বা মহাজাগতিক আমলাতন্ত্র তৈরি করে। কিন্তু সর্বজ্ঞ ঈশ্বরের ব্যবস্থায় হিসাবরক্ষক কেন দরকার?
অধিকন্তু, পরকাল প্রশ্নের সঙ্গে স্বাধীন ইচ্ছার প্রশ্ন জড়িত।
মানুষ যদি নিজের কর্মের জন্য দায়ী হয়, তবে ভাগ্যলিপির ভূমিকা কী? আর যদি সব আগে থেকেই নির্ধারিত হয়, তবে পাপীকে শাস্তি দেওয়া ন্যায়সঙ্গত কি? ফলে দেখা যায়, আরজ আলী ধর্মকে আক্রমণ করছেন না শুধু; তিনি ন্যায়বিচারের ধারণাকেই পরীক্ষা করছেন।
৮. ধর্ম বিষয়ক: ভাগ্য, হেদায়েত, আচার ও মানবিকতার দ্বন্দ্ব
চতুর্থ প্রস্তাব বইয়ের সবচেয়ে তীক্ষ্ণ অংশগুলোর একটি। এখানে একটি বিখ্যাত প্রশ্ন দেখা যায়: “আল্লাহ মানুষের পরিবর্তন না করিয়া হেদায়েতের ঝঞ্ঝাট পোহান কেন?”
প্রশ্নটি উত্তেজনাকর বা উসকানিমূলক। তবে এর ভিতরে গভীর ঈশ্বরতত্ত্বীয় সমস্যা আছে।
ঈশ্বর যদি চান মানুষ সৎ হোক, তবে তিনি সরাসরি মানুষের মন পরিবর্তন করেন না কেন? যদি পারেন, তবে নবী, গ্রন্থ, ভয়, শাস্তি, হেদায়েত—এসব দীর্ঘ ব্যবস্থার প্রয়োজন কেন? যদি না পারেন, তবে সর্বশক্তিমানত্বের অর্থ কী?
আচারগতভাবে, ধর্ম বলে মানুষকে পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু আরজ আলী জিজ্ঞেস করেন: পরীক্ষক যদি ফল আগে থেকেই জানেন, তবে পরীক্ষা কেন? আবার, মানুষ যদি ভাগ্যের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তবে পাপের দায় মানুষের ওপর কেন?
এই অধ্যায়ে কেবল তত্ত্ব নয়, সামাজিক আচারও আলোচিত। পবিত্রতা, অপবিত্রতা, খাদ্য বিধি, কেবলা, কোরবানি, প্রার্থনা, মেরাজ, ফেরেশতা—এসব বিষয়কে তিনি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন। ফলে ধর্ম তাঁর কাছে কেবল পরকালীন ব্যাপার নয়; ধর্ম সামাজিক আচরণ, ক্ষমতা, ভয় ও কুসংস্কারের ক্ষেত্রও।
৯. প্রকৃতি বিষয়ক: অলৌকিকতার বদলে কারণ অনুসন্ধান
পঞ্চম প্রস্তাবে লেখক প্রকৃতি, দেহ, আকাশ, পৃথিবী, জন্ম, মৃত্যু, রোগ, আলো-বাতাস, জীবনের উৎপত্তি ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন করেন। তাঁর মূল মনোভাব হলো: যেখানে প্রাকৃতিক কারণ অনুসন্ধান সম্ভব, সেখানে অলৌকিক ব্যাখ্যা বসিয়ে দেওয়া জ্ঞানের কাজ নয়।
এই কারণেই, প্রকৃতি বিষয়ক অংশটি বইয়ের বিজ্ঞান-মনস্ক অংশ। আরজ আলী কোনো পেশাদার বিজ্ঞানী নন; তাই তাঁর সব ব্যাখ্যা আধুনিক বৈজ্ঞানিক যথার্থতার সঙ্গে মিলে যাবে এমন দাবি করা যায় না। তবে তাঁর বৈজ্ঞানিক মনোভাব স্পষ্ট: না বুঝলে প্রশ্ন করো, ভয় পেয়ে থেমে যেয়ো না, প্রমাণ চাই, কারণ চাই, পর্যবেক্ষণ চাই।
এই দৃষ্টিভঙ্গি আজও জরুরি। কারণ আমরা এখনো রোগ, দুর্যোগ, মৃত্যু, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, মানসিক অসুস্থতা, সামাজিক সংকট—এসবকে কখনো কখনো অলৌকিক ব্যাখ্যায় সরিয়ে দিই। আরজ আলী বলেন, না; প্রকৃতিকে বুঝতে হবে প্রকৃতির নিয়মে।
১০. বিবিধ অংশ: ভাষা, পুরাণ, আচার ও অর্থের সমস্যা
ষষ্ঠ প্রস্তাব “বিবিধ” অংশে লেখক নানা ধর্মীয় ভাষা, প্রচলিত শব্দ, আচার ও লোক বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন করেন। এখানে মেরাজ, শয়তান, ধর্মীয় নাম, পবিত্র বর্ণনা, অলৌকিক যাত্রা—এসবের ভাষাগত ও যুক্তিগত সমস্যা উঠে আসে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হলো—তিনি শব্দকে/বাক্যকে সন্দেহ করেন। যেমন, “আসা” ও “যাওয়া” শব্দের ভিতরে দূরত্ব, স্থান ও গতি আছে। ঈশ্বর বা ফেরেশতার ক্ষেত্রে এসব শব্দ ব্যবহার করলে অর্থ কী দাঁড়ায়? যদি দূরত্ব না থাকে, তবে যাতায়াতের অর্থ কী? যদি স্থান না থাকে, তবে অবস্থানের অর্থ কী?
এর মানে হলো, আরজ আলী শুধু বিশ্বাসের সমালোাচনা করেন না; তিনি শাব্দার্থিক সমালোচনাও করেন। তাঁর প্রশ্ন: ভাষা কি সত্যকে স্পষ্ট করছে, নাকি আবছা করছে?
১১. উপসংহার: ধর্ম নয়, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে অভিযান
সত্যের সন্ধান-এর উপসংহারে লেখকের অবস্থান সবচেয়ে স্পষ্ট। তিনি বলেন, বর্তমান যুগ বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদের যুগ। আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে, তিনি জানান তাঁর অভিযান অসত্য ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে, কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে নয়। আমি অন্তত তা মনে করি।
এই বক্তব্য বইটির নৈতিক কেন্দ্রবিন্দু । অনেকেই আরজ আলীকে শুধু ধর্মবিরোধী দার্শনিক হিসেবে পড়ে থাকেন। কিন্তু তা অসম্পূর্ণ পাঠ। ধর্মের বিরুদ্ধে না গিয়ে তিনি ধর্মীয় দাবিকে প্রশ্ন করেন, কারণ তা মানুষের জীবন, নৈতিকতা, ভয়, মৃত্যু ও সামাজিক আচরণকে প্রভাবিত করে। তিনি বিশ্বাসের বিরুদ্ধে নন; তিনি অসত্যের বিরুদ্ধে। তিনি মানুষের চিন্তার স্বাধীনতার পক্ষে।
এতএব, এই বইকে “নাস্তিক বই” বলে শেষ করা যায় না। বইটি আসলে প্রশ্নের অধিকার নিয়ে।
৪. “অনুমান”: পুরাণ, ইতিহাস ও বিকল্প পাঠ
অনুমান অংশে আরজ আলী আরেক ধরনের কাজ করেন। এখানে তিনি সরাসরি প্রমাণ নয়, সম্ভাব্য ব্যাখ্যা বা hypothesis নিয়ে কাজ করেন। ভূমিকার ভাব থেকে বোঝা যায়, যুক্তিহীন কথা তিনি গ্রহণ করেন না; কিন্তু যেসব কাহিনীর সরাসরি প্রমাণ নেই, সেগুলোকে তিনি অনুমানের আলোয় পড়তে চান।
রচনাসমগ্র-১-এর দ্বিতীয় বড় গ্রন্থ “অনুমান”। এর রচনাকাল ১৩.৪.১৩৮৮ থেকে ৮.৩.১৩৮৯ বঙ্গাব্দ এবং প্রকাশকাল কার্তিক ১৩৯০।
“অনুমান”-এর ভূমিকায় লেখক বলেন, মানুষ অনুমানকে অবিশ্বাস করলেও দৈনন্দিন জীবন অনুমান ছাড়া চলে না। সব কথা সঙ্গে সঙ্গে প্রমাণ করা যায় না, কিন্তু বক্তব্যের যুক্তি থাকা চাই। তিনি “সত্যের সন্ধান”-এ যুক্তির সাহায্যে সত্য খুঁজেছিলেন; “অনুমান”-এ তিনি মিথ, পুরাণ, ধর্মকাহিনি ও ঐতিহাসিক দাবির বাস্তব বা অবাস্তব রূপ খুঁজতে “অনুমান” পদ্ধতি গ্রহণ করেন।
রাবণের প্রতিভা
রাবণকে প্রচলিত রামায়ণকথায় রাক্ষস, অসুর, দুষ্ট চরিত্র হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু আরজ আলী জিজ্ঞেস করেন: বিজয়ীর লেখা কাহিনিতে পরাজিতের চরিত্র বিকৃত হতে পারে না কি? তিনি রাবণের অশোক কানন, পুষ্পক বিমান, শক্তিশেল, লঙ্কার সংগঠন—এসবকে উন্নত প্রযুক্তি, নন্দনবোধ ও রাষ্ট্রক্ষমতার চিহ্ন হিসেবে পড়েন।
এখানে তিনি পৌরানিকতা উলটাপালট করে দেন। অর্থাৎ, প্রচলিত দুষ্কৃতকারী কে তিনি নতুন চোখে দেখেন। এতে ঐতিহাসিক সত্য প্রমাণিত হয় না; কিন্তু পাঠক শেখে, কোনো কাহিনী একপাক্ষিক হতে পারে।
ফেরাউনের কীর্তি
ফেরাউন-প্রবন্ধে লেখক বাইবেলীয় ও ধর্মীয় ইতিহাসকে রাজনৈতিক-জাতিগত দৃষ্টিতে পড়েন। তিনি “ফেরাউন” শব্দকে কোনো এক ব্যক্তির নাম নয়, মিশরীয় রাজাদের উপাধি হিসেবে বিবেচনা করেন। তাঁর প্রশ্ন: ঈশ্বর যদি সর্বজনীন হন, তবে কেন বিশেষ জাতির রাজনৈতিক গল্পে তিনি এত পক্ষপাতীভাবে হাজির হন?
ভগবানের মৃত্যু
“ভগবানের মৃত্যু” প্রবন্ধে শব্দের দ্ব্যর্থতা নিয়ে এক ধরনের তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ আছে। এখানে “ভগবান” কোনো metaphysical ঈশ্বর নয়; বরং মানুষের নাম। এই প্রবন্ধ দেখায়, শব্দের ধর্মীয় মর্যাদা ও দৈনন্দিন ব্যবহারের মধ্যে কত অদ্ভুত সংঘাত তৈরি হতে পারে।
আধুনিক স্বর্গ
“আধুনিক স্বর্গ” অংশে লেখক প্রাচীন দেবতা ও আকাশযাত্রার কাহিনিকে উন্নত প্রযুক্তি বা ভিনগ্রহী সভ্যতার সম্ভাবনা দিয়ে পড়তে চান। আজকের বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডে এই অংশ অনুমানমূলক; তবে এর উদ্দেশ্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি অলৌকিককে প্রযুক্তিগত বা প্রাকৃতিক ব্যাখ্যায় নামিয়ে আনতে চান।
মেরাজ
মেরাজ বিষয়ে লেখক ইসলামী ঐতিহ্যের ঊর্ধ্বযাত্রা কাহিনিকে একক ঘটনা হিসেবে নয়, বিভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্যের আকাশ যাত্রার ধারায় পড়েন। [PDF পৃ. ১৬৩-১৭৬] তাঁর পদ্ধতি comparative: এক ধর্মের কাহিনি অন্য ধর্মের কাহিনির সঙ্গে তুলনা করলে অলৌকিকতার দাবি নতুন আলোয় দেখা যায়।
শয়তানের জবানবন্দি
এই প্রবন্ধে শয়তানকে মানুষের পাপের বলির পাটা হিসেবে দেখা হয়। মানুষ নিজের দায় অন্যের ওপর চাপাতে ভালোবাসে। ধর্মীয় ভাষায় সেই অন্যটি হয় শয়তান। আরজ আলী প্রশ্ন করেন, মানুষের পাপ কি সত্যিই শয়তানের, নাকি মানুষের নিজের সামাজিক, মানসিক ও নৈতিক ব্যর্থতা?
৫. অপ্রকাশিত অংশ ও অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি
৭.১ বেদ-এর অবদান
এই অংশে বৈদিক মন্ত্র, আর্য-অনার্য সম্পর্ক, যজ্ঞপ্রথা ও সামাজিক-ধর্মীয় বোধ নিয়ে নোটধর্মী আলোচনা আছে। উদ্ধৃত মন্ত্রগুলোর মাধ্যমে লেখক দেখাতে চান, প্রাচীন ধর্মগ্রন্থও সামাজিক-রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, শত্রুতা, ধনলাভ, রক্ষা ও বিজয়ের ভাষায় গঠিত।
৭.২ ভাবি প্রশ্ন / না-বুঝের প্রশ্ন
অপ্রকাশিত “সত্যের সন্ধান”-ধর্মী প্রশ্ন তালিকায় লেখকের বহু প্রশ্নের কাঁচা রূপ দেখা যায়। যেমন: “নিরাকার পদার্থ দৃষ্টিগোচর হয় কিভাবে?”, “পাপ-পুণ্যের ডায়রী কেন?”, “আল্লাহ মানুষের মন পরিবর্তন না করিয়া হেদায়েতের ঝঞ্ঝাট পোহান কেন?”
এই অংশ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেখায়—“সত্যের সন্ধান” কোনো আকস্মিক বই নয়; বহু বছর ধরে জমে থাকা প্রশ্নের সংকলিত রূপ।
৭.৩ টুকিটাকি
“টুকিটাকি” অংশে বিচিত্র ব্যবহারিক নোট, এমনকি “বাজী তৈয়ারের ব্যবস্থা”-র মতো উপকরণতালিকাও পাওয়া যায়। এই অংশ আরজ আলীর practical curiosity বা হাতে-কলমে জানার প্রবণতার দিক দেখায়।
৭.৪ আমার জীবনদর্শন
এই অংশে তাঁর বাল্যকালের মহাকাশবিদ্যা সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা আছে। শিশুকালে তিনি শুনেছেন “আকাশ সাতটি”, পৃথিবী থালার মতো, তারকারা আকাশে ঝুলে আছে—ইত্যাদি লোক বিশ্বাস। পরে বিজ্ঞানপাঠ ও প্রশ্নচর্চা সেই বিশ্বাসগুলিকে ভেঙে দেয়।
এই অংশ পুরো রচনাসমগ্রের ব্যক্তিগত চাবিকাঠি: তাঁর দর্শন বই থেকে শুরু হলেও জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।
৮. বইটির প্রধান ধারণা: এক নজরে
- প্রশ্ন ধর্মবিরোধী নয়; প্রশ্ন সত্যের অনিবার্য পদ্ধতি।
- সত্যের মানদণ্ড দরকার; বহুমত একসঙ্গে সত্য হতে পারে না।
- ধর্মীয় বয়ানের অস্পষ্টতা—আত্মা, ঈশ্বর, পরকাল, ভাগ্য, ফেরেশতা, মেরাজ—যুক্তির আলোয় পরীক্ষা করা উচিত।
- বিজ্ঞান কুসংস্কার ভাঙার প্রধান হাতিয়ার।
- লেখকের লক্ষ্য ধর্মের বিরুদ্ধে নয়; অসত্য ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে।
- পুরাণ ও ধর্মকাহিনি বিজয়ীর লেখা ইতিহাস হতে পারে; তাই বিকল্প অনুমান দরকার।
- ব্যক্তিগত জীবন, দারিদ্র্য, মায়ের মৃত্যুর সামাজিক আঘাত এবং স্বশিক্ষা—সব মিলেই আরজ আলীর দর্শনের জন্ম।
৬. সমালোচনামূলক মূল্যায়ন
আরজ আলী মাতুব্বরের শক্তি তাঁর প্রশ্নে।
তিনি দার্শনিক পরিভাষার জটিল ভাষা ব্যবহার করেন না; বরং সাধারণ মানুষের ভাষায় কঠিন metaphysical বা অধিবিদ্যামূলক প্রশ্ন তোলেন। তাঁর দুর্বলতা হলো—কিছু জায়গায় “অনুমান” অতিরিক্ত অনুমানমূলক হয়ে যায়, বিশেষত দেবতা বা মহাকাশ-মানব সংক্রান্ত আলোচনায়।
কিন্তু তবুও ঐতিহাসিক গুরুত্ব কমে না, কারণ তাঁর আসল কাজ হলো বাঙালি মুসলিম গ্রামীণ সমাজে প্রশ্ন করার সাহসকে বৈধতা দেওয়া।
“রচনাসমগ্র-১” তাই শুধু ধর্মসমালোচনার বই নয়; এটি বাঙালির লোকজ যুক্তিবাদ, স্বশিক্ষা, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং মানবতাবাদী চেতনার দলিল। আরজ আলী মাতুব্বরের সবচেয়ে বড় শিক্ষা: সত্যকে ভয় করলে বিশ্বাস দুর্বল হয়; সত্যকে প্রশ্ন করলে বিশ্বাস, জ্ঞান ও সমাজ—তিনটিই পরিষ্কার হয়।
৭. অন্যান্য বইয়ের সাথে তুলনা: এই বইয়ের মতো আর কী পড়া যায়?
বার্ট্রান্ড রাসেলের Why I Am Not a Christianরাসেল ধর্মীয় বিশ্বাসকে যুক্তি, নৈতিকতা ও প্রমাণের আলোয় বিচার করেন। আরজ আলীও একইভাবে ধর্মীয় দাবিকে প্রশ্ন করেন, কিন্তু তাঁর ভাষা বেশি লোকজ ও বাংলার সামাজিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত।
ড্যানিয়েল ডেনেটের Darwin’s Dangerous Ideaডেনেট evolutionary idea দিয়ে ধর্ম, মন, অর্থ ও নৈতিকতার ভিত্তিকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেন। আরজ আলী ততটা একাডেমিক নন, কিন্তু তাঁর প্রশ্নও অলৌকিক ব্যাখ্যার বদলে প্রাকৃতিক কারণ খোঁজে।
স্টিফেন হকিংয়ের ঈশ্বর-ভাবনা বিষয়ক লেখা। হকিং মহাবিশ্বকে বৈজ্ঞানিক নিয়মে বোঝার চেষ্টা করেন। আরজ আলীও প্রকৃতি ও মহাবিশ্বকে ধর্মীয় কল্পনার বদলে যুক্তির আলোয় দেখতে চান।
আহমদ শরীফের মুক্তবুদ্ধি-চর্চাআহমদ শরীফ শহুরে বুদ্ধিজীবী ভাষায় যে মুক্তচিন্তার কথা বলেন, আরজ আলী তা বলেন গ্রামীণ অভিজ্ঞতা থেকে।
৮. বইটির শক্তি ও সীমাবদ্ধতা
শক্তি:
প্রথমত, বইটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো প্রশ্নের সাহস। দ্বিতীয়ত, ভাষা সহজ। তৃতীয়ত, বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িত। চতুর্থত, তিনি জ্ঞানের উৎস হিসেবে ভয় নয়, অনুসন্ধানকে রাখেন। পঞ্চমত, তিনি ধর্মকে সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন।
সীমাবদ্ধতা:
তবে, কিছু জায়গায় তাঁর অনুমান অতিরিক্ত অনুমান নির্ভর। বিশেষ করে “আধুনিক স্বর্গ” অংশে ভিনগ্রহী বা উন্নত প্রযুক্তির অনুমান আজকের বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডে প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস নয়।
অধিকন্তু, তাঁর কিছু বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আজকের বিজ্ঞান অনুযায়ী সেকেলে হতে পারে। কিন্তু এতে করে বইটির ঐতিহাসিক ও বৌদ্ধিক গুরুত্ব কমে যায় না। কারণ বইটির মূল শক্তি চুড়ান্ত বৈজ্ঞানিক যথার্থতা নয়; এর মূল শক্তি হলো প্রশ্ন করার প্রক্রিয়া।
৯.. উপসংহার
আরজ আলী মাতুব্বর রচনাসমগ্র-১ সাধারণ পাঠকের জন্যও, বিশেষজ্ঞ পাঠকের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ পাঠক বইটি থেকে শিখবেন কীভাবে বিশ্বাসকে প্রশ্ন করতে হয়।
বিশেষজ্ঞ পাঠকগণ অনুধাবন, আমার মতো, করে থাকবেন যে কীভাবে আনুষ্ঠানিক প্রাতিষ্ঠানি প্রশিক্ষণ ছাড়াও একজন মানুষ গভীরতম দার্শনিক সমস্যা সমূহকে সাধারণ ভাষায় উপস্থাপন করতে পারেন।
জগতকে, নিজেকে, নিজের অবস্থান কে, ধর্মীয় বিশ্বাসকে চিন্তা শক্তি দিয়ে অনুধাবন করতে চাইলে পড়ুন আরজ আলী মাতুব্বর রচনাসমগ্র।
আরজ আলী মাতুব্বর রচনাসমগ্র-১* আমাদের শেখায়: সত্যকে ভালোবাসা মানে সব উত্তর জানা নয়; সত্যকে ভালোবাসা মানে প্রশ্ন করতে ভয় না পাওয়া। আরজ আলী মাতুব্বরের উত্তর সবসময় চূড়ান্ত নাও হতে পারে, কিন্তু তাঁর প্রশ্নগুলো আজও জীবিত।
সেই কারণেই বইটি পড়া দরকার—বিশ্বাস ছাড়ার জন্য নয়, বরং বিশ্বাস, জ্ঞান ও মানবতার সম্পর্ক নতুন করে ভাবার জন্য।






